রিকশার প্যাডেলে জীবিকা, হাতে চারা—বৃক্ষপ্রেমী আব্দুস সামাদ শেখের অনন্য জীবনগাথা

ফরিদপুরের বৃক্ষপ্রেমিক আব্দুস সামাদ শেখ ছিলেন পরিবেশপ্রেমী সাধারণ মানুষের মধ্যে এক অসাধারণ উদাহরণ।

চলুন জেনে নেই তিনি কে ছিলেন…….

তিনি পেশায় ছিলেন রিকশাচালক, কিন্তু তাঁর জীবনের বড় লক্ষ্য ছিল যেখানে সম্ভব সেখানে গাছ লাগানো। তিনি বৃক্ষপ্রেমিক হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। প্রায় ৪৮ বছর ধরে প্রতিদিন অন্তত একটি করে গাছ লাগানোর চেষ্টা করেছেন। ধারনা করা হয় তিনি প্রায় ৫০ হাজার গাছ রোপন করেছেন। তবে এটি তাঁর নিজের বা কোনো সরকারি হিসাব নয় সংবাদ প্রতিবেদনে প্রকাশিত আনুমানিক সংখ্যা হিসেবে ধরা হয় । সামাদ শেখের জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত সাধারণ।

রিকশা চালিয়ে যে টাকা আয় করতেন, তার একটি অংশ দিয়ে চারা কিনতেন। অনেক সময় সংসারের বাজার করার আগেই তিনি গাছের চারা কিনে ফেলতেন। ফরিদপুরের এক সাধারণ রিকশাচালক আব্দুস সামাদ শেখ নিজের জীবনের সামান্য উপার্জন থেকে টাকা বাঁচিয়ে বছরের পর বছর গাছ লাগিয়েছেন। নিজের এক টুকরো জমি ছিল না, অথচ ফরিদপুর শহরের রাস্তার পাশে, সরকারি জায়গায়, পুকুরপাড়ে, নদীর ধারে, যেখানে একটু মাটি পেয়েছেন, সেখানেই সবুজের চিহ্ন রেখে গেছেন, তাঁর কাছে পুরো পৃথিবীটাই যেন ছিল নিজের বাগান।

অসুস্থ অবস্থায় ২০১৭ সালে তিনি ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। একদিন তাঁকে হাসপাতালের নির্ধারিত বিছানায় পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে দেখা যায়, তিনি হাসপাতালের চত্বরেই একটি গাছের চারা রোপণ করছেন এবং তাতে পানি দিচ্ছেন। অর্থাৎ শরীর তখন অসুস্থ, জীবন তখন অনিশ্চিত তবুও গাছ লাগানোর অভ্যাস তাঁকে হাসপাতালের বিছানায় আটকে রাখতে পারেনি।

তাঁর এই অসাধারণ কাজ জাতীয় পর্যায়েও মানুষের নজরে আসে। দ্য ডেইলি স্টার তাদের ২৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে তাঁকে সম্মাননা দেয় এবং তাঁকে একজন ‘চেঞ্জ মেকার’ হিসেবে তুলে ধরে। আব্দুস সামাদ শেখ ২০১৭ সালের আগস্টে, প্রায় ৬০ বছর বয়সে, মৃত্যুবরণ করেন।

আব্দুস সামাদ শেখ এখন জীবিত নেই তবে ফরিদপুরের বিভিন্ন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলো তাঁর স্মৃতি বহন করে। কোনো গাছের ছায়ায় পথচারী বিশ্রাম নেন, কোনো গাছে পাখি বাসা বাঁধে, কোনো গাছে ফল ধরে, অক্সিজেন দেয়। তিনি প্রমাণ করে গেছেন, পরিবেশ রক্ষার জন্য বড় পদ বা বড় অর্থের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন হয় ইচ্ছার। মানুষ মারা যায়, কিন্তু মানুষের ভালো কাজ কখনো কখনো তাকে বাচিয়ে রাখে।

আব্দুস সামাদ শেখও তাই বেঁচে আছেন ফরিদপুরের কোনো রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা গাছে, কোনো পুকুরপাড়ের ছায়ায়, কোনো ফলের গাছের ডালে, কিংবা কোনো পথিকের সামান্য বিশ্রামের মুহূর্তে।

আব্দুস সামাদ শেখের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর সবচেয়ে সুন্দর উপায় তাঁর নামে শুধু স্মরণসভা করা নয়। আমরা ফরিদপুর সিটি অর্গানাইজেশন প্রতিবছর তার স্মরণে বৃক্ষরোপন কর্মসূচির উদ্যোগ গ্রহণ করে থাকি তার আদর্শ আমরা অনুসরন করি এবং ভবিষ্যত প্রজন্মকেও অবহিত করি তার গুণাবলির কথা।

বৃক্ষ প্রেমিক আব্দুস সামাদ শেখ এর মৃত্যুবার্ষিকীতে ফরিদপুর সিটি অর্গানাইজেশন এর পক্ষ থেকে বিনম্র শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *