Tagged: চকবাজার ইতিহাস ফরিদপুর

0

আমার দেখা চকবাজার পর্ব ৩

পুরনো মাছবাজার ও মারোয়ারি পর্টি:আমার দেখা চকবাজার – পর্ব ৩লিখেছেন জনাব কামরুল বারি কামাল।ফরিদপুর চকবাজার কবে থেকে শুরু ? খুবই কঠিন প্রশ্ন। বুয়েটের Department of Urban and Regional Planning- এর একটি Thesis পেপার থেকে জানা যায়, ফরিদপুর চকবাজারের বিস্তার শুরু হয় ১৬৬৬ সনে যখন ফরিদপুর মোঘল শাসনের আওতায় আসে, অর্থাৎ সুবেদার শায়েস্তা খাঁর আমলে। চক একটি হিন্দি শব্দ যার অর্থ রাস্তার মোড়ের উন্মুক্ত বাজার বা হাট। ফরিদপুর চকবাজার হাট দিয়ে শুরু হয়ে আস্তে আস্তে এটি বাজারে পরিনিত হয়েছে।মোঘল আমলে শুরু এই হিসেবে চকবাজারের বয়স ৩৫০ বছরের উপরে।তবে মোঘল আমলে বাজারের বিস্তৃতি কতদুর ছিল তা বলা মুশকিল।আমি দৃষ্টি আকর্ষন করছি সংযুক্ত গুগল ম্যাপের স্নাপসটে যেখানে চকবাজারের পরিধিসহ পৃথক পৃথক বাজারের অবস্থান দেখানো হয়েছে।আমার মতে গুগল ম্যপে যে জায়গাটুকু চকবাজার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে তা বাজার বা হাট হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে ৩৫০/৪০০ বছর ধরে, প্রথমে আকারে ছোট ছিল আস্তে আস্তে তা বড় আকার ধারন করছে।বাজারটি কেন এই জায়গায় হলো তার একটি ভৌগলিক/ভূতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা আছে যদিও ব্যাখ্যাটি আমার একান্ত নিজেস্ব।বাংলাদেশ পৃথিবির সবচাইতে বড় বদ্বীপ(Delta), ফরিদপুরের উৎপত্তি পদ্মা ও বহ্মপুত্রের বদ্বীপের সৃষ্টি থেকে।এই দুই নদীর বহনকৃত পলি জমে জমে জমি উচু হয়ে ফরিদপুর, বরিশাল ও নোয়াখালির সৃষ্টি।ফরিদপুর শহরের প্রাকৃতিক ভূপৃষ্ঠ বন্যার স্বাভাবিক স্তর( Natural Flood Level) থেকে নীচে, তাই আমাদের ছোটবেলায় (যখন Sluice gate ও বন্যা রক্ষা বাধ ছিল না) বন্যার সময় পুরো শহর পানির নীচে নিমজ্জিত থাকতো তবে চকবাজার ব্যতীত।এটাকি মানুষের তৈরি ? তিন চারশ বছর আগে মানুষ অন্য যায়গা থেকে মাটি কেটে এত বড় যায়গা উচু করবে এর সম্ভবনা খুব কম। প্রাকৃতিকভাবে অন্য যায়গা থেকে বেশী পলি জমেও জায়গাটা উচু হয়ে থাকতে পারে অথবা কোন ভূমিকম্প থেকেও হতে পারে।আটারো শতক ও তার আগের প্রায় প্রতি শতকেই একটা দুইটা বড় ভূমিকম্প হয়েছে এ অঞ্চলে। ভূমিকম্প থেকে চকবাজারের উচু জমির সৃষ্টি হতে পারে।ফরিদপুর জেলার মত জলাভূমি পূর্ন অঞ্চলে নদীর পাশে স্বাভাবিক বন্যার চেয়ে একটি উচু জমি বাজারের জন্য উৎকৃষ্ট স্থান ।যখন এ অঞ্চলে নৌযানই ছিল একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম তখন ফরিদপুর চকবাজার তার ‘নদীরপাশে উচু জমি’ এই চারিত্রিক বৈশিষ্টের কারণে এই জায়গাটি বড় বানিজ্যিক কেন্দ্রে পরিনিত হয়।এই অঞ্চলের অনান্য হাট/বাজার যেমন নগরকান্দা, সালথা, তালমা, সদরপুর, পুকুরিয়া, ভাংঙ্গা, টেকেরহাট, মাদারীপুর, পালং, মোকসেদপুর, গোপালগন্জ, কানাইপুর, বোয়ালমারী, কামারখালী, নড়াইল, মাগুরার পন্য আদান প্রদান ও কেনা বেচার কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই ফরিদপুর চকবাজার।বাজারের বর্তমান গঠণ থেকে এটা ধারনা করা যায় ম্যাপের পিংক রেখা চিহ্নিত রাস্তাটি প্রাথমিক পর্যায়ে উন্মুক্ত বাজার / হাট অথবা কাচা ঘরে মিশ্রিত উন্মুক্ত বাজার /হাট হিসেবে ব্যবহৃত হতো।কালের আবর্তে চওড়া উন্মুক্ত স্থান (রাস্তা) রেখে দুই পাশে টিনের ঘরের বিভিন্ন ধরনের দোকান গড়ে উঠে। আমরা ছেটবেলায় দেখেছি হাটবারে সবচাইতে বেশী পন্যের সমাগম হতো এই রাস্তাটিতে, এটাই ছিল হাটের প্রান।চকবাজারের স্পর্শকাতর বাজার মাছবাজার।আমাদের সময় আপনি বাজার করতে কতটা পটু তা নির্ভর করে যুক্তিসঙ্গত দামে ভাল মাছ কিনতে আপনি কতটা পারদর্শী তার উপর। তখনকার মাছবাজার অনেক সমৃদ্ধ ছিল মাছের গুনগত মান ও বৈচত্র্যের দৃষ্টিকোন থেকে। তখন ফরিদপুর চকবাজারে কোন বরফ দেওয়া মাছ বিক্রি হতো না, আরো দুটো জিনিষ বিক্রি হতো না এ বাজারে – শুটকি মাছ ও গরুর মাংস।গরুর মাংস বিক্রি হতো না এটা এ প্রজন্মকে বিশ্বাস করানো কঠিন। এটা ধূর্বতারার মত সত্যি।তখন গোটা দেশের অর্থনীতি, কৃষিকাজ, মালপরিবহন ইত্যাদি ভিষনভাবে নির্ভরশীল ছিল গরুর উপর। গেরস্ত কতটা স্বচ্ছল তার পরমাপ ছিল গোয়ালে গরুর সংখ্যার উপর।মেয়ের বিয়ে দিতে আগে খোজ নিত ছেলের বাড়িতে কয়টা গরু আছে? এটা হলো পুরো দেশের অবস্থা এর সাথ ফরিদপুরে মাছের প্রাচুর্যতা ও সহজলভ্যতা যোগ হওয়ায় গরুর মাংস না খাবার সংস্কৃতি গড়ে উঠে।খাসির মাংস বিক্রি হতো মাছবাজারের পূর্ব-দঙ্গিন কোনায়, মাত্র দুজন মাংস বিক্রেতা / কসাই বসতে ওখানে। গরু মাংস বিক্রি হতো ষ্টেশন রোডের এক বিহারির দোকানে তবে সকালে কিনে সারাদিন চূলোর উপর রেখে জ্বাল দেবার পরও সন্দেহ থাকতো মাংস সেদ্ধ হওয়া নিয়ে।বৃদ্ধ গরু জবাই হতো যা হাল চাষে যোগ্য নয় বা যে গাই আর দুধ দেয় না। কোরবানির সময় ছাড়া ভালো গরুর মাংস খাওয়া হতো না।তবে গরুর চেয়ে খাসি বেশী কোরবানি হতো। সাধারনত সাতজনে মিলে ভাগে একটা গরু কোরবানি দিত।স্বাভাবিকভাবে রেষ্টুরেন্টে গরুর মাংস রান্না হতো না।গরু মাংস বানিজ্যিকভাবে বিক্রি শুরু হয় শরিয়াতুল্লাহ বাজার চালু হবার পর।মাছ বাজারে ফিরে আসি, বাজারের প্রধান মাছ ইলিশ।ফরিদপুরের তখনকার ইলিশ বেঁচার পদ্ধতিটা একেবারে বিরল অন্য জায়গা তুলনায়।জেলে রাতে ধরা প্দ্মার ইলিশ বাঁশের ছাপি/ঝুড়ি করে সকালে বাজারে নিয়ে আসতো বিক্রির উদ্দেশ্যে।ইলিশ দিয়ে ঝুড়িটা সাজাতো এত সুন্দর করে তা আমি কিভাবে বোঝাবো? দুই থেকে আড়াই ফুট ব্যসের ঝুড়ির ভেতর কলাগাছের খোলস/ ফ্যতরার তৈরি একটা বড় ডোনাট (Donut) বসানো থাকতো। ডোনাটের উপর এক একটা ইলিশকে বক্রাকারে(curved) একটার গায়ের সাথে একটা লাগিয়ে বৃত্তকারে সাজানো থাকতো। এই মাছের ডালা সাজানোটা এতটাই সুন্দর তা ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়।এইভাবে মাছ সাজবার পিছনে একটি ব্যবসায়িক কারণ আছে।তাজা ভালো ইলিশ চেনার তখনকার প্রচলিত সূচক – ১। ভালো মাছে ধরা পরার পর বাকা (Curved) আকার ধারন করে। ২। ডিমবিহিন মাছ খেতে ভালো ৩। তাজা ভালো মাছের কানের ফুলকি রক্তের মত লাল । এক নম্বর সূচকের কারণেই মাছ কলাগাছের খোসার ডোনাটের উপর বাকা করে সাজানো হতো যাতে মাছ সমতল ভূমিতে রাখার পরও বাকা অবস্থায় থাকে।কারণ যাই হোক মাছের ডালি সাজাবার নান্দনিক সৃজনশীলতাকে স্বীকৃতি দিতেই হবে, কথায় বলে ‘প্রথমে দর্শণধারী পরে গুনবিচারী’ । এখনও বাজারে বরফছাড়া তাজা ইলিশ এভাবে ডালি সাজিয়ে আনা হয় কিনা জানিনা? তখনকার মাছ বাজারের সাইজ ৪০ফুট x ৫০ ফুট, টিনের ছাউনি, সান বাধানো মেঝে চারদিকে খোলা। বিক্রেতারা মাছ নিয়ে বসতো ছয় ইঞ্চি উচু সানবাধানো ব্লকে ভাগকরা মেঝেতে আর ক্রেতারা ব্যরহার করতো ব্লকের মাঝে নীচুতে তিনফুটের মতো চওড়া পায়েচলা পথ। সকালের মাছের বাজারে বেশ ভিড় হতো ক্রেতার ভির ঠেলে মাছ ওয়ালা পর্যন্ত পৌছানো কষ্টসাধ্য ব্যাপার।প্রায়ই ঘটতো, অনেক ছোট বেলায় মাছ বাজারে এক হাত দিয়ে ধরে আছি বাবার কানি/কেনি আঙ্গুল আরেক হাতে থাকা খালুই (ছিদ্রযুক্ত বাঁশের হাতলওয়ালা মাছ বহনের ঝুড়ি) ফেসে গেছে পিছের দুই লোকের মাঝে, সামনে পিছে কোথাও যেতে পারছি না।মাছের প্রাকার ভেদে ভিন্ন ভিন্ন ব্লকে মাছ বিক্রি হতো।ইলিশ,পাংগাশ,রুই কাতলসহ বড় মাছ বিক্রি হতো পশ্চিম পাশে দালালের মাধ্যমে।ইলিশ বিপনন- জেলে (মাছের স্বত্বাধিকারী) মাছভর্তি ঝুড়িটা দালালের(জেলের মাছ বিক্রির প্রতিনিধি) কাছে সপে দিয়ে চুপটি করে পিছে বসে থাকবে।ক্রেতা ও প্রতিনিধির সংলাপের মধ্যে জেলে কখনই হস্তক্ষেপ করত না।মাছ বিক্রির টাকা ক্রেতার কাছ থেকে নিয়ে প্রতিনিধি জেলেকে দিত, সে টাকাটা তার মাজায় গোজা থলেতে রেখে দিত। ক্রেতা ঝুড়িতে রাখা পছন্দমত একটা মাছ দেখিয়ে বলতো , “এই মাছটা দেখান”। প্রতিনিধি মাছটা তুলে কান উচু করে ফুলকি দেখাবে তারপর নীচে রেখে দেখাবে মাছ কতটা বাকানো আকার ধারন করে আছে। ফুলকির রং পছন্দ না হলে অন্য তাজা মাছ দেখাতে বলতো ( মাছটা কত আগে ধরা পরেছে তার উপর নির্ভর করে ফুলকি কতটা লাল, মাছ ধরা পরা থেকেই প্রাকৃতিক নিয়মে পচনক্রিয়া শুরু হয়ে যায়, যত সময় পার হবে ফুলকির রং লাল থেকে ফ্যকাসে হতে থাকবে।ফুলকি ফ্যকাসে হয়ে যাওয়া মানে মাছ নষ্ট হয়ে গেছে খাবার যোগ্য নয়। এখন ফুলকি দেখে মাছ যাচাই করা কঠিন ফরমালিন দিয়ে মাছের পচন দীর্ঘায়িত করা হয় ফরমালিনতো বিষ আবার রক্ত মাখিয়ে ফুলকি লাল করা হয় , কোন রকম ফরমালিন না ব্যবহার করে শুধু বরফে সংরক্ষিত মাছ তুলনামূলকভাবে ভালো তবে আমাদের সময়কার বরফবিহিন সতেজ মাছের স্বাদ অতুলনিয়)। ক্রেতা মাছ দেখে কখনও বলতো “নাহ মাছে ডিম আছে?” দালাল তখন দুই আঙ্গুল দিয়ে মাছের পেট চেপে ধরে সামনে থেকে লেজের কাছে প্রাকৃতিক ছিদ্র পর্যন্ত নিয়ে সাদা দুধের মত একটা পদার্থ বের করে বলতো, “দেহেন ডিম নাই”।এটা দালালের হাতের কারসাজি/কেরামতি। “দেহেন ডিম নাই” এমন মাছ কাটার পর দেখা গেছে ডিম ঠিকই আছে। মাছের পেটের আকার দেখে আন্দাজ করে নিতে হবে ডিম কি সাইজের তবে অভিজ্ঞতার প্রয়োজন। ছোট ডিমওয়ালা ইলিশ ডিমছাড়া মাছের সমতুল্য ।ডিমছাড়া ইলিশ পাওয়া ভাগ্যের ব্যপার, পুরুষ ইলিশের ডিম নেই কিন্তু ধরা পরে কম।মোটামুটি সাইজের পুরুষ ইলিশ স্বাদে সেরা। একজন ক্রেতা যখন দামাদামিতে ব্যস্ত তখন কিছু ক্রেতা তা পরখ করতো আজকে কত দামে মাছ বিক্রি হচ্ছে তা জানার জন্য। মাছের দর উঠানামা করতো স্বাভাবিকভাবে চাহিদা ও সরবরাহের উপর। কোন কোন সিজনে এত বেশী মাছ ধরা পরতো পচুর ইলিশ অবিক্রিত থেকে যেত। অবিক্রিত মাছ যাতে নদীতে না ফেলা হয় এর জন্য পৌরসভা মাকিং করে সতর্ক করে দিত এবং নিদৃষ্ট জায়গায় মাটি খুরে গর্তে মাটি চাপা দিয়ে দিত।পরিবেশ রক্ষার মানসিকতায় তখনকার সমাজ এখনকার থেকে এগিয়ে ছিল।তখন মানুষ র্নিদ্বিধায় নদীর পানি পান করতো।তাইতো প্রবাদ ছিল ‘জাতের মেয়ে কালোও ভালো আর নদীর জল ঘোলাও ভালো’। এই প্রবাদ ও নদীর জল দুটোরই মৃত্যু হয়েছে।যাইহোক ইলিশ বেচাকেনায় চলে যাই। দরদামের সন্তোষজনক সমাপ্তির পর দালাল কলা গাছের খোলস/ফ্যতরার রশি (আধা ইঞ্চি X আধা ইঞ্চি) দিয়ে মাছটা বেধে (ফ্যতরার রশি কানসার/কানের ভেতর দিয়ে নিয়ে মাছের মুখ দিয়ে বের করে রশির দুই প্রান্ত গিরা দিয়ে হাত দিয়ে বহন করার উপযোগী একটা লুপ তৈরি করে দিত) ক্রেতার হাতে ধরিয়ে দিত। ইলিশ লোকেরা সাধারনত খালুইতে নিত না হাতে ধরে ঝুলিয়ে নিয়ে যেত, মজাটা শুরু হতো এখান থেকে, মাছবাজার থেকে বের হয়ে গন্তব্যে পৌছানোর আগ পর্যন্ত পরিচিত অপরিচিত যার সাথেই দেখা হবে সেই জিজ্ঞেস করবে “মাছটা কত নিলো”, উত্তর “একটাকা দুইআনা”, বিভিন্ন পতিউত্তর, “ও আচ্ছা, ভালো কিনেছেন, দামটা একটু বেশী হয়ে গেছে” ইত্যাদ্দি।এর উপর একটা গল্প ছিল, গল্পটা কতটা সত্যি তা জানিনা তবে মুখে মুখে প্রচলিত ছিল।গল্পটা হলো গোয়ালচামটের একলোক মাছবাজার থেকে একটা সুন্দর ইলিশ কিনে বাড়ির দিকে রওনা দিয়েছে একজন জিজ্ঞেস করলো,”ভাই দাম কত নিলো” জবাবে বললো,”পাচসিকা (একটাকা চার আনা)”, আবার আর একজন জানতে চাইলো একই উত্তর “পাচসিকা” ময়রা পর্টি পার হতেই বিশজনকে বলা হয়ে গেছে।সে আলীমুজ্জামান ব্রিজ পার হবার সময় আরো কয়েকজন দাম জানতে চেয়েছে, ব্রিজের মাঝামাঝি যখন এসেছে আর একজন মাছের দাম জানতে চাইলো এর মধ্যে পাচসিকা বলতে বলতে হাপিয়ে গেছে তখন সে বিরক্ত হয়ে “বালসিকা” বলে মাছ ছুড়ে নদীতে ফেলে দেয়।এটা হয়তোবা একটা বানানো গল্প তবে ইলিশ কিনে হাতে ঝুলিয়ে বাড়ি নিয়ে যাবেন আর দাম জানতে চাইলে সাচ্ছন্দে দামটা জানাবেন এটা তখনকার লৌকিকতা এটা আপনি এড়িয়ে যেতে পারবেন না।ইলিশ,পদ্মা ও ফরিপুরের মধ্যে একটা যোগসাজস আছে তাই ইলিশের উপর বেশী লেখা হয়ে গেল।পদ্মার আর কিছু ছোট বড় ভালো মাছ বাজারে আসতো।পাংগাস(বিশাল আকারের), আইড়,রুই, রিঠা,বাচা,ঘাওড়া, এর মধ্যে রিঠা সবচাইতে দামী ও সুস্বাদু তবে ধরা পরতো কম তাই বাজার আমদনিও ছিল কম।অনেক ধরনের বিলের ও নদীর মাছ আসতো দুর দুরান্ত থেকে।ভালো কই মাছ পাওয়া যেত বিক্রি হতো বাইসা(এক বাইসা মানে বাইসটা মাছ) হিসাবে, প্রচলিত জিজ্ঞাসা “মাছের বাইসা কত?”।এই বাইসার হিসাবের ব্যখ্যা বা ইতিহাস জানা নেই।কোন মাছই ওজন দিয়ে বিক্রি হতো না।বড় মাছ পিস হিসাবে, বেশী বড় মাছ কেটে ভাগে বিক্রি হতো অনেক সময় কয়েকজনে মিলে মাছ কিনে কাটিয়ে ভাগ করে নিত।অনান্য মাছ ভাগে/থোক হিসাবে বিক্রি হতো।শিং মাগুর নিজের পছন্দ ও সংখ্যা অনুযায়ী থালায় উঠিয়ে দর দাম করে কিনতে হতো।তখনকার দুটি সস্তা মাছ চিংড়ি ও বাইলা/বেলে এখন দামী মাছ।চিংড়িকে মাছের দলে ফেলা হতনা, বলা হতো পানির পোকা তাই দাম কম ছিল।খুবই ছোট কুচা চিংড়ি ভাগে বিক্রি হতো দুই ভাগ কিনলে একভাগ ফাউ।বাইলা মাছের রক্ত নাই তাই এ মাছের কোন উপকারিতা নেই, এই ধারনার কারণে বিক্রি কম দামও কম।’বাচা’ মাছের তুলনা নেই তবে দ্রুত পচনশীল হওয়ায় সতেজ মাছ পাওয়া মুশকিল,বেছে বেছে কিনতে হয়।বাচা জাতের আর একটি মাছ সাইজে বড় খেতে ভালো নাম ঘাওরা,দুর্নাম গু খায় তাই লোকে কিনতে চায় না। এ মাছও দ্রুত পঁচনশীল তাই বরফ/ ফ্রিজে রাখা মাছও বেশীদিন সতেজ রাখা যায় না। দুটো মাছ, চাষের মাছ (Farm fish) আসার আগ থেকেই আস্তে আস্তে ফরিদপুর থেকে হারিয়ে যেতে থাকে।একটি ‘সরপুটি’ আরেকটি টাটকেনি, আগের সরপুটি সরের রংয়ের তাই নাম সরপুটি এবং এখনকার তথাকথিত সিলভার রংয়ের সরপুটি থেকে ছোট কিন্তু খেতে অতুলনীয়।একভাগে চারটা করে চার ভাগ পুঁটি একটা থালায় সাজানো হতো বিক্রির জন্য। ঐ সরপুটি সত্যিই মিস করি। ফরিদপুরে যে টাটকেনি পাওয়া যেত তা ঢাকার এখনকার টাটকেনি থেকে ছোট, মাছের মাংসে ছোট ছোট পাতলা কাটা থাকতো যা গলায় বিধতো না কিন্ত ভাজা মাছে আলাদা মচমচে স্বাদ যোগ করতো।মৎস্য মন্ত্রনালয় উদ্যোগ নিয়েছে হারানো দেশী মাছ পূনউদ্ধার করার, দেশী হারানো মাছ আবার ফিরে আসুক এই প্রত্যাশা নিয়ে মাছের ছাপি বন্ধ করছি।গুগল ম্যাপের হলুদ রংয়ের চিহ্নিত রেখার রাস্তাটি স্থায়ী স্থাপনার সমন্বয়ে একান্তই বাজার হিসেবে গড়ে উঠেছে।রাস্তার পূবের অংশটি কাপড়ের বাজার আর পশ্চিমের যে অংশটি মারোয়ারির দখলে ছিল তা মনোহারি,হোসিয়ারি ও কাপড়ের দোকান মিলিয়ে সৃষ্টি। ‘রাণী ষ্টোর’ নামে মারোয়ারির একটি চালু দোকান ছিল আমরা বাজি, ঘুড়ির সুতো, মাঠ বা বাড়ি সাজাবার রঙ্গিন কাগজ, খেলনা, পছন্দের ছোটখাটো জিনিষ এখান থেকেই কিনতাম।রাণী ষ্টোরের উল্টোদিকে মারোয়ারিদের দুটি দোকান ছিল যার প্রধান ব্যবসা বাজি বিক্রী।অতি বিস্ফোরক বাজিসহ অনেক ধরনে বাজি পাওয়া যেত এই দোকন দুটিতে।পূজো,বিয়ে, ঈদ, অন্যান্য সামাজিক ও রাষ্ট্রিয় উৎসবে বাজি ফুটাবার প্রচলন ছিল।কিছু বাজি ছিল অতি বিস্ফোরক, আমাদের প্রিয় বাজি ছিল ʼরকেটʼ বাজি, বাশের চটার আগায় রকেট আকৃতির বাজি লাগানো থাকতো এবং রকেটের নীচের দিকের সলতাতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হতো – রকেটের মতো পিছে আগুন প্রজ্বলিত করে উপরের দিকে উঠে যেত বেশ কিছুদুর (চল্লিশ/পঞ্চাশ ফুট) উঠার পর বারুদ শেষ হয়ে গেলে আগুন নিভে নিশ্বেষ হয়ে যেত।আর একটি বাজি ছিল অপূর্ব সুন্দর বাজি(নাম মনে নেই)- ছোট পাতিল আকৃতির মাটির পাত্রের ভিতর বারুদ আর পাত্রের মূখে সলতা লাগানো থাকতো আগুন জ্বালাবার জন্য, পাত্রটি মাটিতে রেখে সলতাতে আগুন দেবার পর বাজিটি চারদিক আলোকিত করে তিন চার ফুট উচু হয়ে হিস হিস শব্দে আগুনের ফুলকির ফোয়ারা তৈরি করতো, ত্রিশ থেকে চল্লিশ সেকেন্ট স্থায়ী থাকতো।ফুলঝরি আতশবাজি, বিভিন্ন ধরনের ও সাইজের পটকা, তারাবাজিসহ অনেক বৈচিত্র্যের বাজি পাওয়া যেত।তারাবাজি নিরাপদ বাজির ভিতর সবচাইতে ভালো বাজি দামেও সস্তা, আগরবাতির মতো দেখতে, নীচের অংশ হাতে ধরে উপরের অংশে আগুন দিলে তারার মত দেখতে একটার পর একটা আগুনের ফুলকি বিচ্ছুরিত হতো আর আমারা হাত ঘোরাতে থাকতাম যাতে তারাগুলো একটা চক্রের আকারে নীচে পরে।তারাবাজির ফুলকিতে চামড়া দগ্ধ হতো না এবং জামাকাপড়েও আগুন ধরতো না।বাজি ফুটাবার মজা বেশীদিন উপভোগ করতে পারিনি, ১৯৬৫ সনে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের পর বিস্ফোরক দ্রব্যের ব্যবহার সিমিত করে দেয়ার ফলে ভালো বাজি বানানো বন্ধ হয়ে যায়।গুগল ম্যাপে ‘মারয়ারি পার্ট/কলোনি’ চিহ্নিত জায়গাটিতে মারোয়ারিরা আনুমানিক দুশ বছর ধরে ব্যবসা ও বসবাস করে আসছে। ফরিদপুর চকবাজারের মারোয়ারিদের নিয়ে লেখা ইতিহাস বা প্রবন্ধ কোথাও আমি পাইনি।বাংলাদেশে মারোয়ারিদের আগমন মোঘল আমলে তবে বড় ধরনের আগমন ঘটে ইংরেজ শাষনের আমলে।এরা আঠারো শতকের প্রথম দিকে সুদুর রাজস্থান থেকে ফরিদপুরে আসে ব্যবসা করার জন্য। এরা যে দুশ বঁছর আগে ব্যবসার জন্য এখানে আসে তা মারোয়ারিদের মুখেই আমরা শুনেছি।এদেশে ওদের ব্যবসা গুলো হলো- টাকা ধার দেয়া, হুন্ডি, টাকা বিনিয়োগ, ব্যাংক ব্যবসা, কাপড় ও পাটের ব্যবসা,আড়তদারি ও দোকানদারি ইত্যাদি।নীলের (Indigo) কারবার ও পাটের ব্যবসায় বিনয়োগই মারোয়ারিদের ফরিদপুরে আগমনের প্রধান কারণ বলে আমার ধারনা।এরা জাত ব্যবসায়ি তাই ফরিদপুর চকবাজারের বিভিন্ন ব্যবসার সাথে নিজেদের সম্পৃত করে বাজারের ভিতর এদের নিজস্ব পর্টি/কলোনি গড়ে তুলে, ।এই কলোনির বাইরে কিছু অতি ধণী মাড়োয়ারি বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করতো ঝিলটুলীতেই একজন থাকতো নামটা ভুলেগেছি, অম্বিকাপুরে একজন থাকতো এরও নামটা মনে নেই।বাজারে পুরাতন মাছ বাজারের দঙ্গিনে এক ধণী মাড়োয়ারি থাকতো সম্ভবত ১৯৭৫ সনের দিকে ভারতে চলে যায়। মাড়োয়ারিরা হিন্দু বা জৈন ধর্মাবলম্বী, গনেশ ও লক্ষ্মীর পূজারি।এদের জীবনধারা বঙ্গালী হিন্দুদের থেকে আলাদা। এরা একশোভাগ নিরামিষ ভোজি, ঘিয়ের রান্না খুব পচ্ছন্দ।Community living অর্থাৎ সম্প্রদায় হিসেবে বসবাস করাকে প্রাধান্য দেয়, বয়োজেষ্ঠদের নিয়ে গঠিত পঞ্চায়েতের অনুশাষণ মেনে চলে।নিজেদের সম্প্রদায়ের কেউ আর্থিক অনটনে উপনিত হলে সম্প্রদায়ের তরফ থেকে তাকে সাহায্য করা হয়।চরম পুরুষ শাষিত সমাজ, মেয়েদের কোন নিজস্ব অধিকার নেই, সংসার বচ্চাকাচ্চা সামলানোই প্রধান কাজ, লেখাপড়া করতে পারবে না, বাইরে যেতে পারবে না সর্বক্ষনিকভাবে লোকচক্ষূর অন্তরালে থাকতে হবে।লোকচক্ষূর অন্তরালে থাকার সীমাটা কতদুর তার একটি উদাহরন দেই।চকবাজারের পেটের ভিতর বিশাল জায়গা নিয়ে মাড়োয়ারিরা পরিবার পরিজনসহ দুশ বছর যাবত বসবাস করে আসছে, কিন্তু এমন একটি লোককে আপনি খুজে পাবেন না যে একঝলকের জন্যও মারোয়ারি মহিলা/মেয়েকে দেখেছে বলো দাবী করতে পারবে ! মহিলাদের পর্দার অন্তরালে থাকার এত বড় অনুশাষন আর কোন জাতি/গোষ্টির মধ্যে আছে বলে জানা নেই।বছরে অন্তত একবার মহিলারা ঘরের বাইরে আসতো দূর্গাপূজার অষ্টমি বা নবমিতে দলবেধে প্রতিমা দেখতে তবে যতবড় ঘোমটা দিয়ে থাকতো মুখ দেখার উপাায় নেই।যখন কলেজে পড়ি আমরা কয়েকজন মিলে পুজোর সময় মারোয়ারি মহিলার মুখ দেখবো বলে চেষ্টা চালাই, মিশনটা পুরোপুরি ব্যর্থ, এতবড় ঘোমটা ভেদ করে মুখ দেখা অসম্ভব।এদের বিয়ের অনুষ্ঠান বেশ বড় ও জাকজমকপূর্ণ,অনষ্ঠিত হতো ঘেরাও (Enclosed) জায়গায়। ছোটবেলায় বেশ কয়েকটা বিয়ে দেখেছি, সাধারনত হিতৈষী স্কুলের মাঠে বিয়ের অনুষ্ঠানটা হতো। স্কুলের মাঠ ও স্কুল ঘর চার পাচ দিনের জন্য ভাড়া নিয়ে টিন দিয়ে পুরোটা ঘিরে ফেলতো যাতে বাইরের কেউ ঢুকতে না পারে।ঘেরা জায়গাতেই চার পাচ দিন ধরে আনন্দঘন পরিবেশ বিয়ে সম্পন্য হতো।অনুষ্ঠানের শেষের কোন দিনে বর সুসজ্জিত হাতি বা ঘোড়ার পিঠে চড়ে ব্যান্ড পার্টিসহ ব্যান্ডের ছন্দে শহর প্রদক্ষিন করতো, এটা বেশ উপভোগ্য ছিল।ʼমারোয়ারি পর্টি ʼএখনো আছে কি নেই এ বিষয়ে আমার ধারনা নেই।শুনেছি বেশীর ভাগই ভারতে চলে গেছে।পারটিশনের পর এ দেশ থেকে মাড়োয়ারিরা চলে যাওয়া শুরু হয়। ছোটবলায় মাড়োয়ারিদের অন্তত ১৯৬৫ সনের যুদ্ধের আগ পর্যন্ত যা দেখিছি তাতে ওদের মধ্যে ভীতি বা অসন্তোষ লক্ষ্য করিনি, যুদ্ধের পরে কিছু মারোয়ারি এখান থেকে চলে গেছে তবে সংখায় খুবই নগন্য।শুনেছি ১৯৭৫ সনের পর থেকে মারোয়ারিদের চলে যাবার সংখা বেড়ে যায়।মারোয়ারিরা ফরিদপুরের ইতিহাসের একটি অংশ, তাই মারোয়ারিদের উপর গবেষণা মূলক অনুসন্ধান চালিয়ে তথ্য যোগার করে এদের ইতিহাসকে লিপিবদ্ধ করা উচিত।

0

আমার দেখা চকবাজার পর্ব ২


আমার দেখা চকবাজার
পর্ব ২ : কবি কাজী নজরুল ইসলাম
লিখেছেন জনাব কামরুল বারি কামা।
কবি কাজী নজরুলের ইসলামের ফরিদপুর সফরের কথা সবার জানা। তবুও সংক্ষেপে বলছি। বলার আর একটি কারণ হলো একবারের সফরের কবি জসিমউদ্দিন নজরুলকে নিয়ে চক বাজারের গিয়েছিল দুপুরের খাবার খেতে। আমার বিষয়বস্থু হলো সেই ‘হোটেল’, যেখানে দুজনে লাঞ্চ সেরেছিলেম।
নজরুল অন্তত সাতবার বৃহত্তর ফরিদপুরে আসেন – পাঁচবার ফরিদপুর শহরে, একবার মাদারীপুরে এবং একবার পাংশায়। শহরের তিনবারের সফরের বর্ণানা জসিমউদ্দিনের ‘যাঁদের দেখেছি’ বইতে লেখা আছে।একবারের বর্ণনা জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনিতে লেখা আছে।
কবি নজরুল প্রথম আসেন ১৯২৫ সালে বাংলার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনে, অনুষ্ঠিত হয় ফরিদপুরে। অল বেঙ্গল কংগ্রেস কনফারেন্স, অল বেঙ্গল স্টুডেন্ট কংগ্রেস কনফারেন্স এবং অল বেঙ্গল মুসলিম কংগ্রেস কনফারেন্স।
ওই সম্মেলন তিনটিতে উভয় বাংলার ব্রিটিশ বিরোধী রাজনৈতিক দলসমূহের নেতা-কর্মী ও ছাত্র নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন। বঙ্গীয় কংগ্রেসের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ফরিদপুর টেপাকোলা মাঠে। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ওই সম্মেলনে যোগ দিয়ে তার বিখ্যাত গান ও কবিতা পরিবেশন করেন। পল্লীকবি জসীম উদ্দীন এতে স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সম্মেলনে এসে কবি নজরুল একজন বামপন্থী নেতাসহ চারজনের একটি দল পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের বাড়িতে ওঠেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের (৫.১১.১৮৭০-১৬.৬.১৯২৫) সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সম্মেলনে মহাত্মাগান্ধী (১৮৬৯-১৯৪৮), নেতাজী সুভাস চন্দ্র বসু (২৩.১.১৮৯৭-১৯.৮১৯৪৫), সরোজিনী নাইডু (১৮৭৯-১৯৪৯), মওলানা আবুল কালাম আজাদ (১৮৮৮-২২.২.১৯৫৮) যোগ দিয়ে বক্তৃতা করেন।সম্মেলনটি স্থায়ী হয়েছিল তিন দিন, বাইরে থেকে আসা নেতা ও কর্মীরা তাবুতে অবস্থান করেছিল।
ভারতবর্ষের শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতিতে ইংরেজ শাষন আমলে এত বড় একটা সম্মেলন ফরিদপুরে অনুষ্ঠিত হওয়া ফরিদপুরের জন্য গর্ব ও সম্মানের ব্যাপার। এই সম্মেলন এটাই প্রমান করে যে সেই সময় ফরিদপুরের ব্রিটিশ বিরোধী রাজনৈতিক চিন্তা, চেতনা ও কর্মকান্ড তৎকালিন ভারতবর্ষে সমাদ্রিত ছিল।
দ্বিতীয় সফর – নির্বাচনী প্রচারনা।
১৯২৬ সালে যখন ‘ভারতীয় কেন্দ্রীয় আইনসভা’ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, কবি কাজী নজরুল ইসলাম তখন সারা বাংলায় অত্যন্ত জনপ্রিয় কবি।নির্বাচনে কংগ্রেস-সমর্থিত অর্থাৎ স্বরাজ পার্টির প্রার্থী ছিলেন কবি নজরুল। নির্বাচনী এলাকা (Constituency) – ঢাকা , ফরিদপুর, ময়মনসিংহ ও বরিশাল। এ প্রসঙ্গে পরে আসছি।
তৃতীয় সফর – সনটা আমার জানা নেই, ১৯২৭ সন হবার সম্ভাবনা বেশী। ঐ সফরে কবি জসিম উদ্দিনের লেখার অংশবিশেষ নীচে তুলে ধরলাম ,
“একবার পরলোকগত সরোজিনী নাইডুর সঙ্গে কবি আর হেমন্তকুমার সরকার আমাদের ফরিদপুরে আসিলেন। সরোজিনী নাইডু একদিন পরেই চলিয়া গেলেন। কবিকে আমরা কয়েকদিন রাখিয়া দিলাম।আমি তখন ফরিদপুরের রাজেন্দ্র কলেজে পড়ি। আমরা সকল ছাত্র মিলিয়া কবিকে কলেজে আনিয়া অভিনন্দন দিব, স্থির করিলাম। আমাদের প্রিন্সিপ্যাল কামাখ্যাচরণ মিত্র মহাশয় খুশী হইয়া আমাদের প্রস্তাবে রাজি হইলেন।
খবর পাইয়া ফরিদপুরের পুলিশ-সাহেব আমাদের প্রিন্সিপ্যাল মহাশয়ের নিকট পত্র লিখিলেন, নজরুলের মতিগতি গভর্নমেন্টের বিরুদ্ধে; তিনি তাঁহার বক্তৃতায় সরলমতি ছাত্রদিগকে গভর্নমেন্টের বিরুদ্ধে ক্ষেপাইয়া তুলিবেন। নজরুলকে যদি কলেজে বক্ততা করিতে দেওয়া হয়, তবে সি. আই. ডি. পুলিশদেরও কলেজের সভায় উপস্থিত থাকিতে দিতে হইবে। আমাদের প্রিন্সিপ্যাল কামাখ্যা বাবুর প্রতিও গভর্নমেন্টের মুনজর ছিল না। বহু বৎসর আগে তিনি পুলিশের কোপদৃষ্টিতে অন্তরীণ ছিলেন। নজরুলকে দিয়া বক্ততা করাইলে পরিণামে কলেজের ক্ষতি হইতে পারে বিবেচনা করিয়া তিনি আমাদিগকে ডাকিয়া বলিয়া দিলেন, ‘নজরুলকে লইয়া কলেজে যে সভা করার অনুমতি দিয়েছিলাম, তাহা প্রত্যাহার করলাম।’
আমরা মুষড়িয়া পড়িলাম। সবাই মুখ মলিন করিয়া কবির কাছে গিয়া উপস্থিত হইলাম। আমাদের অবস্থা দেখিয়া কবি বলিলেন, ‘কুছ পরওয়া নেই। উন্মুক্ত মাঠের মধ্যে সভা কর। আমি সেইখানে বক্তৃতা দেব।’
তখন আমাদিগকে আর পায় কে! দশ-বিশটা কেরোসিনের টিন বাজাইতে বাজাইতে সমস্ত শহর ভরিয়া কবির বক্তৃতা দেওয়ার কথা প্রচার করিলাম। সন্ধ্যাবেলা অম্বিকা-হলের ময়দান লোকে লোকারণ্য। হাজার হাজার নর-নারী আসিয়া জমায়েত হইলেন কবি-কণ্ঠের বাণী শুনিবার জন্য।
সেই সভায় কবিকে নূতনরূপে পাইলাম। এতদিন কবি শুধু দেশাত্মবোধের কথাই বলিতেন। আজ কবি বলিলেন সাম্যবাদের বাণী। কবি যখন ‘উঠ রে চাষী জগৎবাসী, ধর কষে লাঙ্গল’ অথবা ‘আমরা শ্রমিকদল, ওরে আমরা শ্রমিকদল’ —প্রভৃতি গান গাহিতেছিলেন, তখন সমবেত জনতা কবির ভাব-তরঙ্গের সঙ্গে উদ্বেলিত হইতেছিল। সর্বশেষে কবি তাহার বিখ্যাত ‘সাম্যবাদী’ কবিতা আবৃত্তি করিলেন। সে কী আবৃত্তি, প্রতিটি কথা কবির কণ্ঠের অপূর্ব ভাবচ্ছটায় উদ্বেলিত হইয়া সমবেত শ্রোতৃমণ্ডলীর হৃদয়ে গিয়া ধ্বনিতপ্রতিধ্বনিত হইয়া উঠিতেছিল। মাঝে মাঝে মনে হইতেছিল, কবিকণ্ঠ হইতে যেন অগ্নি-বর্ষণ হইতেছে। সেই আগুনে যাহা কিছু ন্যায়ের বিরোধী, সমস্ত পুড়িয়া ধ্বংস হইয়া যাইবে।”(যাঁদের দেখেছি – জসিম উদ্দিন )
অম্বিকা ময়দানে কাজী নজরুল ইসলাম ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানসহ বহু নেতা মিটিং করে বক্তৃতা দিয়েছে। ১৯৬৯ সন পযন্ত শহরের প্রায় সব রাজনৈতিক মিটিং হতো অম্বিকা ময়দানে। অম্বিকা ময়দানে জনসভা লোকে লোকারণ্য বা কানায় কানায় ভর্তি যে না দেখেছে তাকে বর্ণনা দিয়ে বোঝানো খুব কঠিন। তবুও আমি চেষ্টা করে দেখছি, অম্বিকা হলের বারান্দার সামনে একটি ইট-সিমেন্টর তৈরি ষ্টেজ ছিল বক্তৃতা দেবার জন্য।ষ্টেজটা পরে হয়েছে, আগে বক্তারা অম্বিকা হলের বারান্দায় বসতো।ভালো জনসভায় পুরো মাট ভরে যেত ,মাঠের লোকেরা খাসের উপর বসে বক্তৃতা শুনতো, (মাঠের তিন দিকে সীমানা প্রাচীরের কাছ দিয়ে আট/ নয়টি ইট-সিমেন্টের উপর নিট ফিনিষ্ট আস্তরের(Towel finished plaster) সুন্দর পিছনে হেলান দিয়ে বসার আসন ছিল, তিনজনে আরামে বসা যেত), যারা আগে আসতো তারা এ আসলগুলো দখলে নিতো, কিছু লোক আসন ও আড়াই ফুট উঁচু মোগল স্থপতির আদলে গড়া প্রচীরের ফাঁকা যায়গায় দাড়িয়ে যেত, ঊত্তর ও পূবের রাস্তায় ভর্তিলোক দাড়িয়ে বক্তৃতা শুনতে, সব চাইতে আকর্ষনীয় ছিল চৌরঙ্গি বিল্ডিং( যা এখন নেই, মনে হলে এক ধরনের কষ্ট অনুভব করি।) -এর দুই ও তিনতলার ছুলন্ত টানা বারান্দায় দাড়িয়ে বারান্দা ভর্তি লোকের উপস্থিতি। বড় যাত্রীবাহী জাহাজ নুতন বন্দরে নোঙ্গর করার সময় যাত্রীরা ডেকের রেলিং ধরে দাডিয়ে থাকা দৃশ্যের মত।মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তা সামনে তাকিয়ে চার স্তরের শ্রোতাদের দেখা মাত্র তার বক্তৃতার মান বেড়ে যেত।

চৌরঙ্গী বিল্ডিংয়ের একটা ছবি যুক্ত করলাম, ছবিটার মান ভালো না হওয়ায় বিল্ডিংটা কত সুন্দর ছিল তা বোঝা যাচ্ছে না।শহরে তখন তিনতলার উপরে কোন বিল্ডিং ছিল না এবং তিনতলা সবচাইতে আর্কষণীয় বিল্ডিং ছিল এই চৌরঙ্গী বিল্ডিং। এই বিল্ডিং ছিল শহরের ল্যান্ডমার্ক , দুর গ্রাম থেকে কেউ শহর দেখতে এসে চৌরঙ্গী বিল্ডিং না দেখে চলে যাওয়া মানে শহর দেখা অসম্পুর্ন থেকে যাবার সামিল।’চৌরঙ্গী’ – চৌরঙ্গী বিল্ডিং ও লেক বা ঝিল বাদে বিকলাঙ্গ। চৌরঙ্গী বিল্ডিংয়ের জায়গায় একটি যাচ্ছেতাই বাজে বিল্ডিং তোলা হয়েছে। আমার ক্ষমতা ও টাকা থাকলে ঐ জায়গায় হারানো চৌরঙ্গী বিল্ডিংয়ের মত হুবহু একটি বিল্ডিং তুলে বর্তমান স্বত্বাধিকারীকে বলতাম এটা ব্যবহার করুন কিন্ত ভেঙ্গে ফেলবেন না কারণ এর সাথে শহরের ঐতিহ্য জড়িত।
আমি আমার মূল বিষয়বস্তুতে ফিরি-নজরুলের দ্বিতীয় সফর, ১৯২৬ সন (নির্বাচনী প্রচারনা)। নজরুলের নির্বাচনী প্রচারনা সফরের বর্ণনা কবি জসিম উদ্দিনের লেখায়:
“একদিন গ্রীষ্মকালে হঠাৎ কবি আমার পদ্মাতীরের বাড়ি আসিয়া উপস্থিত। তিনি কেন্দ্রীয়-আইন সভার সভ্য হইবার জন্য দাঁড়াইয়াছেন। এই উপলক্ষে ফরিদপুরে আসিয়াছেন প্রচারের জন্য। আমি হাসিয়া অস্থির : ‘কবিভাই, বলেন কি? আপনার বিরুদ্ধে এদেশে গোঁড়া মুসলিম-সমাজ কাফের বলে ফতোয়া দিয়েছেন। ভোটযুদ্ধে তারাই হলেন সব চাইতে বড় সৈন্যসামন্ত। আমাদের সমাজ কিছুতেই আপনাকে সমর্থন করবে না।’
কবি তখন তার সুটকেস হইতে এক বাণ্ডিল কাগজ বাহির করিয়া আমার হাতে দিয়া বলিলেন, ‘এই দেখ, পীর বাদশা মিঞা আমাকে সমর্থন করে ফতোয়া দিয়েছেন। পূর্ববঙ্গের এত বড় বিখ্যাত পীর যা বলবেন, মুসলিম-সমাজ তা মাথা নিচু করে মেনে নেবে। জসীম, তুমি ভেবো না। নিশ্চয় সবাই আমাকে ভোট দেবে। ঢাকায় আমি শতকরা নিরানব্বই ভাগ ভোট পাব। তোমাদের ফরিদপুরের ভোট যদি আমি কিছু পাই, তা হলেই কেল্লা ফতে। যদি নির্বাচিত হয়ে যাই—আর নির্বাচিত আমি তো হবই, মাঝে মাঝে আমাকে দিল্লী যেতে হবে। তখন তোমরা কেউ কেউ আমার সঙ্গে যাবে।‘
রাতের অন্ধকারে আকাশে অসংখ্য তারা উঠিয়াছে। আমরা দুই কবিতে মিলিয়া তাদেরই সঙ্গে বুঝি প্রতিযোগিতা করিয়া মনের আকাশে অসংখ্য তারা ফুটাইয়া তুলিতেছিলাম।
কেন্দ্রীয় সভার ভোট-গ্রহণের আর মাত্র দুইদিন বাকী। ভোর হইলেই আমরা দুইজনে উঠিয়া ফরিদপুর শহরে মৌলভী তমিজউদ্দিন খানের বাড়ি আসিয়া উপস্থিত হইলাম। তমিজউদ্দিন সাহেব আইনসভার নিম্ন-পরিষদের সভ্য পদের প্রার্থী ছিলেন। তাঁহার প্রতিদ্বন্দ্বী ফরিদপুরের তরুণ জমিদার বন্ধুবর লাল মিঞা সাহেব। আমরা লাল মিঞা সাহেবের সমর্থক ছিলাম। বাদশা মিঞা তমিজউদ্দিন সাহেবকে সমর্থন করিয়া ফতোয়া দিয়াছিলেন। সেইজন্য আমাদের বিশ্বাস ছিল, তমিজউদ্দিন সাহেবের দল নিশ্চয়ই কবিকে সর্মথন করিবেন। কারণ বাদশা মিঞাও কবিকে সমর্থন করিয়া ইতিপুর্বে ফতোয়া দিয়াছেন। আর, লাল মিঞার দলে তো আমরা আছিই। সুতরাং সবাই কবিকে সমর্থন করিবে।
কবিকে সঙ্গে লইয়া যখন তমিজউদ্দিন সাহেবের বাসায় গিয়া উপস্থিত হইলাম, তমিজউদ্দিন সাহেব তাঁহার সমর্থক গুণগ্রাহীদের দ্বারা পরিবৃত হইয়া দরবার সাজাইয়া বসিয়াছিলেন। কবিকে দেখিয়া তাঁহারা সবাই আশ্চর্য হইয়া গেলেন। কবি যখন তাঁহার ভোটঅভিযানের কথা বলিলেন, তখন তমিজউদ্দিন সাহেবের একজন সভাসদ বলিয়া উঠিলেন, ‘তুমি কাফের। তোমাকে কোন মুসলমান ভোট দিবে না।’
তমিজউদ্দিন সাহেবের সঙ্গে আমাদের শত মতভেদ থাকিলেও তিনি বড়ই ভদ্রলোক। কবিকে এরূপ কথা বলায় তিনি বড়ই মনঃক্ষুণ্ণ হইলেন। কবি কিন্তু একটুও চটিলেন না। তিনি হাসিয়া বলিলেন, ‘আপনারা আমাকে কাফের বলছেন, এর চাইতে কঠিন কথাও আমাকে শুনতে হয়। আমার গায়ের চামড়া এত পুরু যে আপনাদের তীক্ষ্ণ কথার বাণ তা ভেদ করতে পারে না। তবে আমি বড়ই সুখী হব, আপনারা যদি আমার রচিত দু-একটি কবিতা শোনেন।’
সবাই তখন কবিকে ঘিরিয়া বসিলেন। কবি আবৃত্তি করিয়া চলিলেন। কবি যখন তাহার ‘মহরম’ কবিতাটি আবৃত্তি করিলেন, তখন যে ভদ্রলোক কবিকে কাফের বলিয়াছিলেন তারই চোখে সকলের আগে অশ্রুধারা দেখা দিল। কবি আবৃত্তি করিয়াই চলিয়াছেন—যে কাজে আমরা আসিয়াছি, সে দিকে তাঁর দৃষ্টি নাই। আমি কবির কানে কানে বলিলাম, ‘এইবার আপনার ইলেকসনের কথা ওঁদের বলুন।’
কিন্তু কে কাহার কথা শোনে! কবি আবৃত্তি করিয়াই চলিয়াছেন। তখন আমি মরিয়া হইয়া সবাইকে শুনাইয়া বলিলাম, ‘আপনারা কবির কবিতা শুনছেন—এ অতি উত্তম কথা। কিন্তু কবি একটি বড় কাজে এখানে এসেছেন। আসন্ন ভোট-সংগ্রামে কবি আপনাদের সমর্থন আশা করেন। এই বিষয়ে কিছু আলোচনা করুন।’
তমিজউদ্দিন সাহেব চালাক লোক। কবিতা আবৃত্তি করিয়া কবি তাঁহার সমর্থক ও ভক্তমণ্ডলীর মধ্যে কিঞ্চিৎ প্রভাব বিস্তার করিয়াছেন। তিনি যে কবিকে সমর্থন করিবেন না, এই আলোচনা তিনি তাঁহাদের সকলের সামনে করিলেন না। কবিকে তিনি আড়ালে ডাকিয়া লইয়া গেলেন। পাঁচ-ছয় মিনিট পরে হাসিমুখেই তাহারা দুইজনে আসরে ফিরিয়া আসিলেন। আসিয়া কবি আবার পূর্ববৎ কবিতা আবৃত্তি করিয়া চলিলেন। আমি ভাবিলাম, কেল্লা ফতে! কবির হাসিমুখ দেখিয়া এবং আবার আসিয়া তাহাকে কবিতা আবৃত্তি করিতে দেখিয়া ভাবিলাম, নিশ্চয়ই তমিজউদ্দিন সাহেবের দল কবিকে সমর্থন করিবে।
কবি আবৃত্তি করিয়াই চলিয়াছেন। বেলা দুইটা বাজিল। কবির সে দিকে হুঁশ নাই। কবির শ্রোতারাই এ বিষয়ে কবিকে সজাগ করিয়া দিলেন। কবি তাহার কাগজপত্র কুড়াইয়া লইয়া বিদায় হইলেন। তাদের মধ্য হইতে একটি লোকও বলিলেন না, এত বেলায় আপনি কোথায় যাইবেন, আমাদের এখান হইতে খাইয়া যান।
আমার নিজের জেলা ফরিদপুরের এই কলঙ্ক-কথা বলিতে লজ্জায় আমার মাথা নত হইয়া পড়িতেছে। কিন্তু এ কথা না বলিলে, সেই যুগে আমাদের সমাজ এত বড় একজন কবিকে কি ভাবে অবহেলা করিতেন, তাহা জানা যাইবে না। অথচ এদেরই দেখিয়াছি, আলেম-সমাজের প্রতি কী গভীর শ্রদ্ধা! কত গরীব ছাত্রকে তমিজউদ্দিন সাহেব অন্নদান করিয়াছেন!
দুইটার সময় তমিজউদ্দিন সাহেবের বাড়ি হইতে বাহির হইয়া ভাবিলাম, এখন কোথায় যাই। আমার বাড়ি শহর হইতে দুই মাইলের পথ; হাঁটিয়া যাইতে পঁয়তাল্লিশ মিনিট লাগিবে। পৌঁছিতে তিনটা বাজিবে। খাওয়া-দাওয়া শেষ করিয়া আজ আর শহরে ফিরিয়া কাজকর্ম করা যাইবে না। স্থির করিলাম, বাজারে কোন হোটলে খাওয়া সারিয়া অন্যান্য স্থানে ভোট-সংগ্রহের কাজে মনোনিবেশ করিব।
পথে আসিতে আসিতে কবিকে জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘তমিজউদ্দিন সাহেবের দল আমাদের সমর্থন করিবে। এবার তবে কেল্লা ফতে!’
কবি উত্তর করিলেন, ‘না রে, ওঁরা বাইরে ডেকে নিয়ে আমাকে আগেই খুলে বলে দিয়েছেন, আমাকে সমর্থন করবেন না। ওঁরা সমর্থন করবেন বরিশালের জমিদার ইসমাইল সাহেবকে।’
তখন রাগে দুঃখে কাঁদিতে ইচ্ছা হইতেছিল। রাগ করিয়াই কবিকে বলিলাম, ‘আচ্ছা কবিভাই, এই যদি আপনি জানলেন, তবে ওঁদের কবিতা শুনিয়ে সারাটা দিন নষ্ট করলেন কেন?’
কবি হাসিয়া বলিলেন, ‘ওরা শুনতে চাইলে, শুনিয়ে দিলুম।’
এ কথার কী আর উত্তর দিব? কবিকে লইয়া হোটলের সন্ধানে বাহির হইলাম। তখনকার দিনে ফরিদপুর শহরে ভাল হোটেল ছিল না। যে হোটেলে যাই, দেখি মাছি ভনভন করিতেছে। ময়লা বিছানা-বালিশ হইতে নোংরা গন্ধ বাহির হইতেছে। তারই মধ্যে অপেক্ষাকৃত একটি পরিষ্কার হোটেল বাছিয়া লইয়া কোন রকমে ভোজনপর্ব সমাধা করিলাম।”(যাঁদের দেখেছি – জসিম উদ্দিন )
আমার জিজ্ঞাসা, কোন হোটেলে খেয়েছিল ? ১৯২৬ সনতো আমি দেখিনি তবে ১৯৬০ সনের চকবাজার দেখেছি। খুব বড় ধরনের কোন পরিবর্তন হয়নি।১৯৬০ সনে শহরে হাতে গোনা অল্প কয়েকটি খাবার হোটেল ( রেষ্টুরেন্ট) ছিল।কিন্তু ১৯২৬ সনে শহরে কোন খাবার হোটেল(রেষ্টুরেন্ট) ছিল না নিশ্চিত।
[উপনিবেশিক শাষন আমলের সেই সময়ে ফরিদপুরের মত ছোট শহরে রেষ্টুরেন্টে খাওয়া বাতুলতার(Vanity)সামিল।তখন লোকেরা কাজে বের হবার আগে সকালে পেটপুরে বাসা থেকে ভাত খেয়ে যেত আর সন্ধায় খেয়ে গল্প গুঝব সেরে রাত আটটার মধ্যে ঘুমিয়ে পরতো। আমরাইতো সকাল দশটায় পেটপুরে খেয়ে স্কুলে চলে যেতাম চারটায় বাড়ী ফেরা মাত্রই মা,”সারাদিন কিছু খাসনাই”বলে খাবার থালা রেডি করে নিয়ে আসতো। প্রায়ই স্কুল থেকে ফিরে খেলার টানে বই রেখে দিতাম দৌড় খেলার মাঠে, মা পিছ পিছ আসতো খাবার থালা নিয়ে “ এই খেয়ে যা, খেয়ে যা “ বলে চিৎকার করতে করতে,কিন্তু নিরুপায় তখন মায়েদের বাইরে যাবার নিয়ম ছিল না।এই সুযোগটি কাজে লাগাতাম, এখন মনে হলে খারাপ লাগে মাকে কষ্ট দেয়ায়।শহরের এক শ্রেণীর খেটে খাওয়া মানুষ এক বেলার বেশী খাবার যোগাড় করতে পারতো না, কালকে কি খাবে জানা ছিল না।বহু মানুষ শুধু ভাতের ভ্যান খেয়ে দিন কাটিয়ে দিত। বাড়ি বাড়ি গিয়ে মাটির গামলা রেখে বলতো,”খালাম্মা /মাসীমা গামলাটা রাইখ্যা গেলাম,ভ্যানটা পরে আইসা নিয়া যাব”।হয়তো ওটা ওর বাচ্চাদের জন্য। সেই তুলনায় আমরা এখন অনেক ভালো আছি,স্বাধীনতার সুফল ও আল্লার রহমত। আল্লাহ যেন আমাদের সবাইকে ভালো রাখে।]
জসিম উদ্দিনের হোটেলের বর্ণনায় ময়লা বিছানা – বালিশের উল্লেখ আছে। অর্থাৎ এটি একটি আবাসিক হোটেল ছিল এর কোন ভূল নেই। আবাসিক হোটেল মানে যেখানে থাকা,খাওয়া, নাওয়ার(স্নানের) বন্দবস্ত রয়েছ। হ্যা, নজরুল ও জসিমউদ্দিন ঐদিন কোন আবাসিক হোটেলেই খেয়েছিল। সেটি কোথায় অবস্থিত ছিল এবং দেখতে কেমন ছিল ? জসিমউদ্দিন আরো উল্লখ করেন অনেকগুলি হোটেল দেখে অপেক্ষাকৃত একটি ভালো হোটেলে দুপুরের ভোজন সম্পন্ন করেন। এটা বোঝা গেল যে ওখানে একসাথে একজায়গায় অনেকগুলো আবাসিক হোটেল ছিল( A cluster of hotels) – ফরিদপুরের ভাষায় ‘আবাসিক হোটেল পর্টি’।গুগল ম্যাপে এর অবস্থান দেখিয়ে একটি স্নাপসট যুক্ত করলাম। ম্যাপে আরো অন্য পর্টিও দেখানো আছে, যেগুলো নিয়ে পরবর্তী পোষ্টে লিখব। তখনকার ফরিদপুর বাজারের বিরল বৈশিষ্ট (Unique characteristic) হলো- ব্যবসার প্রকৃতি ভেদে নিজ নিজ cluster বা পার্টিতে সাজানো। স্বর্ণকার পর্টি, গুর পর্টি, দুধ পর্টি, আবাসিক হোটেল পর্টি, জুতা পর্টি,বই পর্টি,কুমোরপর্টি, ময়রা পর্টি ইত্যাদি।
এবার আসি আমার দেখা ‘আবাসিক হোটেল পর্টির’ আলোচনায়। হোটেল পর্টিতে যাবার তিনটি পথ ছিল, ১.চকবাজার জামে মসজিদের পথ, ২. নিউ মার্কেটের ২ নং গেটের উল্টোদিকের পথ, যার একপাশে দুধ ও পান বাজার আরেক পাশে গুর বাজার।৩.গুর পর্টির ভিতর দিয়ে, যে পথ আমরা বেশী ব্যবহার করতাম। এই এলাকায় আমার প্রায়ই যাওয়া পরতো মায়ের পান ও সাদা / আলাপাতা কেনার নিমিত্তে। মা সাদাপাতা দিয়ে পান খেত যা বাবার মোটেও পছন্দ ছিল না, তাই পান ও সাদা পাতা কেনার দ্বায়িত্বটা একান্তই আমার ঘারে এসে পরতো।গুগল ম্যাপে দেখানো দুধ বাজার তখন এখানে ছিল, একটি বিশাল (৫০ফুট x ২০০ ফুট) চারদিক উন্মুক্ত টিনের চালার ছাউনি, সিমেন্টে বাঁধানো মেঝে।এই ছাউনিতে ছিল দুধ, পান সুপারি ও তামাকের (সাদা/ আলা পাতা) বাজার, পানের দোকান ছাউনির বেশী অংশ জুড়ে থাকলেও এই বাজার দুধ বাজার হিসেবে পরিচিত ছিল। দুধ বাজার বসতো সাধারণত সকালে ছাউনির দঙ্গিন-পশ্চিম অংশে,সকাল দশটার মধ্যে দুধ বিক্রী হয়ে যেত, বিকেলেও দুধের বাজার বসতো ছোট পরিসরে।

দুধ বাজারের ছাউনির পূর্বদিকে ছিল ‘আবাসিক হোটেলগুলো’, দুই ভাগে বিভক্ত। একভাগ ছাউনির মাঝবরাবর থেকে শুরু হয়ে দঙ্গিন প্রান্ত পর্যন্ত পাচ৴ছয়টি হোটেল একসাথে লাগানো, এরপর চার/পাচ ফুটের রাস্তা বর্তমান থানা রোড থেকে শুরু পুকুর পর্যন্ত চলে গেছে।এই রাস্তার দঙ্গিনে দুই/তিনটির আরেক গুচ্ছ হোটেল।এই সারি সারি হোটেলর আমি নাম দিয়েছি ‘আবাসিক হোটেল পর্টি’, এর প্রচলিত নাম ‘দুধ বাজারের হোটেল’।হোটেলের গঠন – দুই পাশে বাঁশের চটার রেড়ার একচালা টিনের ঘর (ছাপড়া আকারের), বিশ ফূট চওড়া ত্রিশ/চল্লিশ ফুট লম্বা।দুটি কামরা, সামেনে বড় শোবার ঘর ও পিছে রান্না ঘর, মাঝে একটি থ্রিকোয়াটারের চটার পার্টিশন দিয়ে কামরা দুটি ভাগকরা।হোটেলের সামনে পিছে উন্মুক্ত, সামনের দিকে চার/পাচ ফুটের ব্যবধানে দুধ বাজার আর পিছে উন্মুক্ত পুকুর পাড়।সামনের কামরায় ১৫/১৬ ফুট চওড়া ও ৭ফুট লম্বা কাঠের চকি (অর্ডারদিয়ে বানানো) ৯/১০ জনের একসাথে শোবার উপযোগী।পাতলা তোশক তার উপর থান কাপড় জোড়া দিয়ে বানানো চাদরের বিছানা আর শোবার জন্য জনপতি একটিকরে ওয়ার বিহিন বালিশ। চকি ও পার্টিশনের মাঝে দশবারো ফুটের ফাকা জায়গা চলাফেরা ও নীচে বসে আহারাদি সারার জন্য।যতদুর মনে পরে মেঝে ছিল মাটির, নিয়মিত গবর দিয়ে লেপা মাটির মেঝে সানের মেঝে থেকে কম নয়।আমাদের সময় শহরে অনেক মাটির মেঝের টিনসেডের বাড়ি ছিল।হোটেলের গঠন থেকেই ঝোঝা যাচ্ছে এটা গরিবের ‘হিলটন’ হোটেল।এখানে কারো থাকতো?
১৯২৬ – ১৯৬০ সনের ফরিদপুর শহরের দিকে তাকাই। প্রথমে দেখি যোগাযোগ ব্যবস্থা,বাস্তবিক অর্থে শহরের সাথে সড়কপথে কোন যোগাযোগ ছিল অতি সামান্য।রেল যোগাযোগ ছিল, সীমিত আকারে এবং অনেকের সামর্থের বাইরে।সবচাইতে বড় যোগাযোগের মাধ্যম নদীপথ আর বহন হলো মানুষচালিত (manually operated) নৌকা।দুর্বল যোগাযোগ ও অর্থনীতির করণে নেহাত প্রয়োজন ছাড়া বাইরে থেকে শহরে কেউ আসতো না।ব্যবসায়ীরা আসতো মালামাল বেচা কেনা করতে।মহাজন ধনী, শহরে আত্মীয় থাকলে তার ওখানে ওঠতো বা অন্য মহাজনের বাড়িতে থাকতো। তখন উচ্চবিত্তর বাড়িতে কাচারি ঘর থাকতো অতিথি আপ্যায়নের জন্য। অনেক মধ্যবিত্তের বাড়িতেও কাচারি ঘর ছিল। যাঁদের কাচারি ঘর ছিল না তাদের আত্মীয় বা চেনা কেউ বাইরে থেকে এলে নিজের বাড়িতে কষ্টকরে থাকতে দিতে হতো , এটাই ছিল রীতি।
মহাজনের ব্যবসায়ী কাজে বাজারে আসা দরিদ্র কর্মচারী, মামলায় জড়ানো বাইরে থেকে আসা লোক যার শহরে থাকার কোন স্থান নেই এ ধরনের লোকেরা এই হোটেলগুলোতে থাকতো বলে আমার ধরনা। তবে এরা এঁই হোটেলের মূল খরিদ্দার (Customer) নয়। মূল খরিদ্দার হলো বাজারের অস্থায়ী কোন কোন ক্ষেত্রে স্থায়ী গৃহহীন ছোট দোকানদার, বড় দোকানের গৃহহীন কর্মচারী,অল্প বেতনের বাইরে থেকে আসা চাকুরিজীবি, এক কথায় গৃহহীন খেটে খাওয়া মানুষের আশ্রয়স্থল। সারাদিন খেটে খুঁটে এসে রাতের খাবার খেয়ে নাক ডেকে ঘুম দিত, তেল চিটচিটে বিছানা বালিশ এদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারতো না।হোটেলের আর একটি ব্যবসা হলো অনাবাসিক খরিদ্দারকে সস্তায় খাবার পরিবেশন করা।তখন বাজারে এমনও দিনমুজুর কাজ করতো যে এই সস্তা হোটেলের খাবার কিনে খেতে পারতো না, দুপরে মুড়ি বাতাসা ও এক চা দিয়ে লাঞ্চ সেরে নিত, দিন শেষে উপার্জনের টাকায় পরিবারের রাতের খাবারের জন্য বাজার করে নিয়ে যেত।
ফরিদপুর বাজারে গরিবের জন্য বিরল (Unique) পুষ্টিকর একটি স্ট্রিট ফুট (Street food) পাওয়া যেত।তবে একটি বিশেষ রাস্তা ছাড়া অন্য রাস্তায় এটা পাওয়া যেত না। রাস্তাটি হলো – ময়রা পর্টির রাস্তা, তিন/ চারটি বিক্রেতা/ দোকান বসতো রাস্তার পূর্ব দিকে উন্মুক্ত আকাশের নীচে।দোকানের সরন্জাম- একটি বহনযোগ্য মাটির চুলা, আগুন জ্বালানোর খড়ি, দেশী লাল গমের আটা, রুটি বেলার বেলুন ও পিঁড়া, রুটি সেঁকার তাওয়া (সবই গ্রহস্থালি সাইজের চেয়ে বড়) , আখের গুরের মোটা পাটালী, এক কলসি পানি ও একটি এলোমুনিয়ামের পনির গ্লাস। খাবারটি – লাল আটার মোটা ( ৬/৮ মি: মি: পুরু) গরম রুটি ( সাধারন সাইজের দ্বিগুন ) সাথে আখের গুরের মোটা পাটালী।গুরের রং ছিল দেখার মতো , সত্যই ফরিদপুরে এক সময় ভালো মানের গুর পাওয়া যেত।মজার ব্যাপার রুটি সেঁকা হতো তাওয়ার উল্টো পিঠে, তাওয়া ঊবুর অবস্থায় চুলের উপর রেখে রুটি সেঁকা হতো।এর দুটি সুবিধা ছিল, ১. রুটি আগুনের তাপ বেশী পেত যাতে পুরুরুটি তাড়াতাড়ি সেদ্ধ হোত ২. খড়ি কম খরচ হতো।হাটের দিন রটি ও গুরের খাবারের বেচাকেনা ভালো হতো।হাটেরদিন একটি বৈশম্যমূলক ঘটনার অবতারনা হতো, মহাজন/ গেরস্থ হাটে আনা পন্য বিক্রী করে তার গরিব কর্মচারী / ভৃত্যকে নিয়ে ময়রা পর্টিতে আসতো, নিজে মিষ্টি খেতে ঢুকতো মিষ্টির দোকানে আর ভৃত্যকে খেতে দিত লাল আটার রুটি ও পাটালী গুর। শুনে আশ্চর্য হবেন একেকজন এক থেকে দেড় সের (এক কেজির অল্প কিছু কম ) করে মিষ্টি খেত, দাড়ি পাল্লায় মেপে দেয়া হতো সেই মিষ্টি । শোনা যায় হাটের দিনে রমরমা মিষ্টি বিক্রির কারনেই এক দুই করে মিষ্টির দোকান বাড়তে বাড়তে এই ‘ময়রা পর্টির’ সৃষ্টি।

0

অদেখা চক বাজার ফরিদপুর, প্রথম পর্ব : কুটিবাড়ি

আমার দেখা চকবাজার :

প্রথম পর্ব : কুটিবাড়ি

প্রথমেই সরাসরি চকবাজার প্রসঙ্গে না গিয়ে ফরিপুরের ইতিহাস ও অন্যান্য বিষয়ের উপর আলোকপাত করছি। ইংরেজী তেরো শতকের সুফি সাধক শাহ শেখ ফরিদউদ্দিন (ফরিদউদ্দিন মাসুদ) -এর নামে ফরিদপুরের নামকরন। তার মানে তেরো শতকে এখানে জনপদ (Township) ছিল যার কারণে শেখ ফরিদ এখানে এসেছিলেন সুফি দর্শন ও ধর্ম প্রচার করতে।

তখনকার টাউনশিপের বৈশিষ্ট ছিল আলাদা , যেমন একশ বছর আগের ফরিদপুর আর এখনকার ফরিদপুর আকাশ পাতাল পার্থক্য, এমনকি পঞ্চাশ বছরেই অনেক তফাৎ।তাই ৬শ বছর আগের শহরের কোন বাস্তব (Tangible) নির্দশন খুঁজে পাওয়া দূষ্কর। পনেরো শতকে সুলতানদের শাষন আমলে সুলতান জালালউদ্দিন শাহ এখানে একটি মুদ্রার(Coin) কারখানা স্থাপন করেন,তখন এখানকার নাম ছিল ‘ফতেহাবাদ’।জানিনা সেই মুদ্রা( স্বর্ন মুদ্রা- Gold coin) তৈরির Legacy থেকেই বর্তমান স্বর্ণকার পট্টির সৃষ্টি কিনা? আমার ছোটবেলা থেকে একটা জিজ্ঞাসা , কি কারনে এত বড় স্বর্ণকার পট্টি গড়ে উঠেছিল ১৫০/ ২০০ বছর আগে? বড়দের মুখে শুনেছি তালমার ওদিকে সোনার কাজে দক্ষ অনেক পরিবার বাস করতো, তাদের কারনেই সোনার ব্যবসায়ীরা এখানে সোনা পট্টি গড়ে তুলে ।এর কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই।সোনার কাজ অনেক সুক্ষ ও স্কিলফুল, চিকন নলে মুখ দিয়ে ফুদিয়ে আগুনের শিখাকে নিয়ন্ত্রণ করে ডিজাইন করতো। এখন আর সে বলাই নেই সবকিছু হয় মেশিনে । তখন স্বর্নকারকে ‘স্যকরা’ বলা হত।আগেকার দোকানগুলো এত ডেকোরেটিভ ছিল না, এত সাইন বোর্ডর বাহার ছিল না । সাদামাটা লোহার সিঁকওয়ালা টিনেরচালার দোকান, টিপিকাল লুক, এখনকার মত কাচের বড় বড় শোকেস ছিল না যেহেতু গহনা তৈরি হতো ক্রেতার পছন্দ অনুযায়ী আগাম নির্দেশে।ফটোএলবামের মত রড়সাইজের ডিজাইনের বই দেখে গহনার অডার করা হতো, কোন কোন ক্ষেত্রে তৈরি গহনা দেখিয়ে বলতো “দাদা এই ডিজাইনের গহনা গড়ে দিবেন”। বাড়ীর গিন্নিরা দোকানে যেতনা বরং স্যকরা বাড়িতে গিয়ে অডার নিতো এবং তৈরির পর বাড়িতে পৌছে দিত।বাড়িতে ডেলিভারির সময় জামার সাইট পকেট থেকে কাপড়ে মোড়ানো গহনা নরম হাতে যত্নসহকারে বের করে বলতো,”দেখেনতো দিদি কেমন হইছে”। এখনও আমার কানে ভাসে মা বলতো, “বাবা বাইরে গেলে অনিল স্যকরার দোকান ঘুরে আসবি, বলবি কাকা,মা আপনাকে দেখা করতে বলেছে”।তখনকার ক্রেতা ও বিক্রেতার যে নিবিড় সম্পর্ক ছিল তা এখনকার আর্থসামাজিক অবস্থায় বোঝানো কঠিণ।আমাদের বাসার কাছে একটা মুদির দোকান ছিল দোকানটা তার বাড়ির সাথে লাগোয়া অতি বিনয়ি লোক, একদিন ওনাকে বললাম, কাকা আমি আপনার ছেলের বয়সি আপনি আমার সাথে কাচুমাচু হয়ে কথা বলেন কেন? বললো “তুমি আমার খদ্দ্যৈর (খরিদদার), খদ্দ্যৈর হলো লক্ষী”।ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে তা হল, Customer is always right । দেশর বর্তমান পরিস্থিতি, Seller is always right.এখনো স্বর্ণকার পট্টিতে পুরনো আদলের কিছু দোকান আছে।দুটি পুরনো দিনের দোকানের ছবি যুক্ত করলাম(গুগল স্টির্ট ভিঊ থেকে নেয়া), দোতলা ও একতলা টিনের চালার ঘর।দোতলা ঘরের নীচ তলা দোকান এবং উপর তলা বাসা, দোকানে এখন লোহার স্টীল সাটার যা আগে ছিল লোহার গাড়দ ও কাঠের ভাজ করা কাঠের পাল্লা যেমনটি এখনও ধরে রাখা হয়েছে একতলা দোকানে।মুজিব সড়কে বর্তমান বাটা ও উল্টোদিকে ফরিদপুর ম্যানসন নামে একটি সুন্দর বিল্ডিং ছিল, এখান থেকে শুরু হয়ে ফায়ার ব্রিগেট অফিস পর্যন্ত রাস্তার দুইধার গায়ে গায়ে লাগানো দোতালা ও একতলা টিনের চালার দোকানের মিশ্রনে সাজানো ছিল এই স্বর্ণকার পট্টি।আমাদের সময় কিছু অন্য ব্যবসার দোকান ʼকাবাব মে হাড্ডিʼ হিসেবে ঢুকে গিয়েছিল এই পট্টিতে।তার প্রধান করণ দেশভাগের পর কিছু দোকনি ভারত চলে যাওয়ায় ঐ গ্যাপ অন্য প্রতিষ্ঠান পুরন করে ,তার সংখা বেশী ছিল না।বর্তমানে অন্য ব্যানিকজিক প্রতিষ্ঠান অতি মাত্তায় বেড়ে যাওয়ায় স্বর্ণকার পট্টির আদি আবহ মলিন হয়ে গেছে ।

এই পট্টিতে কর্মকারদের(কামারের) কিছু দোকন ছিল যা বিলুপ্ত।ফরিদপুর ম্যানসনের পরই পূবে তিন চারটা একসারিতে সাজানো কর্মকারের(Blacksmith) দোকান ছিল, অনেকে ঐ অংশকে কর্মকার পট্টি বলে আখ্যায়িত করতো। মাটির মেঝে তিন দিকে টিনের দেয়াল টিনের চালা সামনে টিনের ঝাপসহ বেশ রড় দোকান।কয়লার আগুনের তাপে(চামরার তৈরি এয়ার বোলোয়ার বাতাস দিয়ে আগুন প্রজ্জলিত করে) গরম লাল লোহাকে বড় হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে দা,বটি,কুলাড়,শাবল,খোন্তাসহ সব ধরনের লোহার সামগ্রী তৈরি করতো এই কর্মকাররা।কামারের কাজটা খুবই পরিশ্রমের কাজ, খালী গায়ে ধুতি কাছা দিয়ে আগুনের সমনো বসে হাতুরি পেটিয়ে গরম লোহাকে সাইজ করা সত্যই অনেক পরিশ্রমের কাজ।কামারের হাতুরির আওয়াজ অনেকটা ঘন্টার শব্দের মত, শব্দদূষনের মধ্যে পরে না (আমার মতে) কারণ এ শব্দ এখনকার গাড়ি চলার ও হর্ণের আওয়াজের মত বিরক্তিকর ছিল না।

 

আবার ফিরে যাই স্বর্নকারে, এদের আর একটি ব্যবসা আদি কাল থেকে চলে আসছে, তা হলো গহনা বন্ধক রেখে টাকা ধার দেওয়া।ইংরেজ আমলে প্রতিষ্ঠিত ফরিদপুরের প্রথম ব্যাংক ‘ফরিদপুর লোন অফিস’ (বর্তমান ভূমি অফিস, দূনীতি দমন কমিশনের ঊত্তরে ), ম্যানেজার শিবেন ভাদুরি ( সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি)।বেশ ছোটবেলায় কথা, পাড়ার লোকেরা বলাবলি করছে , ‘লোন অফিসের লালবাতী জ্বলে গেছে’। ছোট মানুষ জানতে চাইলাম লালবাতী জ্বলে গেছে মানে কি? বললো ব্যাংকের টাকা না থাকলে লালবাতী জ্বলে যায়। বললাম টাকা না থাকার সাথে লালবাতী জ্বলে যাবার সম্পর্ক কি ? বললো ব্যংকের এ অবস্থা হলে হেরিকেন জ্বালিয়ে লাল রংয়ের পাতলা কাগজ দিয়ে মুড়ে বাঁশের আগায় ঝুলিয়ে ব্যাংকের সামনে বেধে দেওয়া হয়, যা দেখে লোকেরা বুঝতে পারে যে এ ব্যংকে টাকা নেই। এখন বুঝি লালবাতী জ্বলে যাওয়া মানে দেউলিয়া (Bankrupt) হয়ে যাওয়া। লোন অফিসতো দেউলিয়া আর লোন দিতে পারবে না তবে উপায় – গহনা বন্ধক রেখে স্যাকরার কাছ থেকে টাকা ধার নেয়া অথবা কাবুলিওয়ালা / পাঠান -এর কাছ থেকে ধার নেয়া এ ছাড়া উপায় কি? এই উপমহাদেশে কাবুলিওয়ালা/পাঠানরা টাকা ধার দেয়ার কারবার করতো।ফরিদপুরেও এদের দেখেছি ১৯৬৭/৬৯ পর্যন্ত।পূর্ব খাবাসপুরের দিকে থাকতো।এদেরকে মজা করে বলতাম, “ঝুট কিউ বলতা হু ” জবাবে বলতো, “পাঠান কভি ঝুট নেহি বলতা “, এর পর বলতাম ,”সুদ কিউ খাতা হায়” ওরা বলতো,”ইয়ে তো মেরা ধান্ধা হায়”।কাবুলিওয়ালাদের ধার নিয়ে অনেক গল্প কাহিনী আছে এ উপমহাদেশে।এদের কথা লিখতে গিয়ে অনেক ছোট বেলার আর একটি স্মৃতি জেগে উঠলো, কোর্ট প্রাঙ্গনে উকিল বারের ঐদিকটায় ইরাণী মহিলারা চশমা,আংটি,ও আংটির পাথর বিক্রী করতো।চশমাগুলো বেশীর ভাগই গান্ধী-চশমা আদলের, ক্রেতা একটা একটা করে চশমা চোখে দিয়ে পরখ করে কিনতো।এরা অনেটা যাযাবরের মত এক যায়গা/শহরে বেশীদিন থকতো না, এরা ইরানী যাযাবর গোত্রের (Persian Gypsy tribe ) বলে আমার ধারনা ।এদেরকে বেশীদিন পাইনি।কথায় কথায় ইতিহাস থেকে অনেকদুর চলে এসেছি, ফতেহাবাদ(আদি ফরিদপুর) ১৫৩৮ সন পর্যন্ত বেঙ্গল সুলতান শাষনের অধিনে “মুদ্রার শহর” হিসেবে বলবত ছিল।

আইন-ই-আকবরী’ (মোগল সম্রাট আকবরের শাষন ব্যবস্থার উপর লেখা{ফার্সিতে লেখা} একটি Documentary বই, লিখেছন আকবরের রাজসভার নবরত্নের এক রত্ন আবুল ফজল- এ বইটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম) -তে ফতেহাবাদকে ʼহাভেলি মহল ফাতেহাবাদʼ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। সুলতান শাষন আমলে ফরিদপুরের আদিনাম ফতেহাবাদ আর মোগল আমলে হাভেলি মহল ফতেহবাদ। আকবরের আমলে ফতেহাবদের সাথে হাভেলি মহল জুড়ে দেবার কারণ ? এবার আসি হাভেলি শব্দের অর্থ কি?

The word haveli is derived from Arabic hawali, meaning “partition” or “private space”, popularised under the Mughal Empire, and was devoid of any architectural affiliations. Later, the word haveli came to be used as a generic term for various styles of regional mansions, manor houses, and townhouses found in the Indian subcontinent.

 

মোগলদের হাভেলির অর্থ বিভাজন বা আড়াল করা দেয়াল, আর হাভেলি মহল – এর অর্থ বিভাজনে তৈরি ব্যক্তিগত স্থান মহল, এক কথায় অন্দর মহল। বিভাজনে তৈরি ব্যক্তিগত স্থান নিশ্চই সোনার করুকার্যে অলঙ্কৃত করে গড়া এবং ব্যক্তিগত মহলে যে রমনিরা থাকতো তাঁরাও সোনার গহনায় সজ্জিত থাকতো। আমি ফতেহাবাদ নামের সাথে বিশেষণ হিসাবে হাভেলি মহল যোগ করার মধ্যে স্বর্ণকারের কারুকার্যের (Goldsmith’s craftsmanship) ঘ্রান পাচ্ছি।আমার ধারনা ঐ সময় এই জনপদের কোন বিশেষ গোষ্টি স্বর্নকারের কারুকার্যে পারদর্শী ছিল। বাংলার একটি ক্ষুদ্র জনপদের নাম ‘আইন-ই-আকবরী’ এর মত প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক বইয়ে অন্তর্ভুক্ত হওয়া মানে এখানে অসাধারন একটা কিছু ছিল যা সুলতান ও মোগল উভয় সাম্রাজ্যকে আকৃষ্ট করে। আইন-ই-আকবরী’ পুরো বইটা পড়তে পারলে হয়তো উত্তরটা পাওয়া যেত।

ইংরেজ শাষন আমলে ফরিদপুরের প্রসাশনিক গোড়াপত্তন ১৭৮৬ সনে ঢাকা জেলার অধিনে আলাদা প্রশাসনিক ইউনিট (ঢাকার মহকুমা )হিসেবে Dacca Jalalpur নামে। ফরিদপুর জেলা নামে পূনাঙ্গ জেলা হিসাবে প্রতিষ্ঠা ১৮১৫ সনে ( কারো কারো মতে ১৮০৭ সনে)।ফরিদপুর সদর, গোয়ালন্দ (রাজবাড়ি), গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুর এই চার মহাকুমা নিয়ে ফরিদপুর জেলার সৃষ্টি। মহাকুমার নাম গোয়ালন্দ ,তবে প্রসাশনিক কাজ পরিচালিত হতো রাজবাড়ির থেকে। ১৯৭৭ সনে শরিয়াতপুরকে মাদারীপুর থেকে পৃথক করে শরিয়াতপুর মহকুমার সৃষ্টি। ১৯৮৪ সনে এই পাঁচটি মহকুমাকে আলাদা পূনাঙ্গ জেলায় পরিণত করা হয়। এ কারণেই বর্তমান ফরিদপুর , রাজবাড়ি, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ও শরিয়াতপুর জেলাকে একত্রে ‘বৃহত্তর ফরিদপুর’ নামে গন্য করা হয়।

ফরিদপুর শহরের মুজিব সড়কের আদি ইতিহাস অনেকের জানা নেই।এই সড়কের আদি নাম ‘যশোর রোড’, পাকিস্তান আমলে এ রোডের নাম রাখা হয় ‘জিন্নাহ রোড’ তবে যশোর রোড হিসেবে বেশী পরিচিতি ছিল। এই রোডের দোকানপাটের সাইনে বোর্ডে আমরা যশোর রোডই লেখা দেখেছি।বেঙ্গল প্রসিডেনসির ১৮৭০-৭১ বার্ষিক প্রতিবদনে উল্লেখ আছে যশোর রোড়ের – যা ফরিদপুরকে কলকাতার সাথে যুক্ত করেছে যশোর ও বনগাওয়ের মাধ্যমে। বিশদভাবে বলতে গেলে ‘যশোর রোড’- ফরিদপুর প্রান্ত থেকে রোডের শুরু টেপাখোলা ঘাট থেকে( বর্তমান মুজিব সড়ক সোজা পূবে গিয়ে যেখানে টেপাখোলা লেকে মিশেছে, যদ্দুর মনে পরে ১৯৬৫/৬৭ পর্যন্ত এখানে সানবাধানো সিড়ির ঘাট ছিল যা টেপাখোলা লঞ্চ ঘাট নামে পরিচিত, ঢাকা যাবার জন্য একমাত্র অবলম্বন লঞ্চ এখান থেকে ছাড়তো দশ থেকে বারো ঘন্টা সময় লেগে যেত ঢাকা যেতে।এখানে একটা মিস্টির দোকানে স্বরের সন্দেশ পাওয়া যেত খেতে অতুলোনিয়, ১৯৬৫/৬৬ সনের দিকে ঢাকার সাথে গোয়ালন্দ – আরিচা ফেরির মাধ্যমে সড়ক যোগাযোগ স্থাপন হওয়ায পর লঞ্চে ঢাকা যাওয়া কমে যায়, লঞ্চ ঘাট অকার্যকর হয়ে পরে, আস্ত অস্তে মিস্টির দোকানসহ অন্যান্য অনেক দোকানকে পাত্তারা গোটাতে হয়।) যশোর রোডের রুট ম্যাপ: টেপাখোলা ঘাট – আদি আলীমুজ্জামান ব্রীজ – মধুখালী – কামারখালী – মাগুরা – ঝিনেইদহ-যশোর – বেনাপল- বনগাঁও – কলকাতা। নীচের অনুচ্ছেদে দৃষ্টি আকর্ষন করছি:

The 1860-61 Annual Report on the Administration of Bengal Presidency noted the existence of feeder roads to serve the EASTERN BENGAL RAILWAY. Annual Report of1870-71 recorded existence of seven important roads in eastern India, all basically radiating from Calcutta and connecting it with about half a dozen other nodal points. Of the seven important road systems in eastern India, three were relevant in the context of development of roads in Bangladesh. These were: (a) the Darjeeling Trunk Road linking Calcutta with Darjeeling through Berhampore, Bhagwangola, Godagari, Dinajpur and Shiliguri; (b) the Jessore Road linking Calcutta with Faridpur through Bongaon and Jessore; and (c) the Chittagong Trunk Road connecting Daudkandi, Comilla and Chittagong. Together with these three trunk roads, there was another significant road bifurcating from the Darjeeling Trunk Road at Dinajpur and going up to the BRAHMAPUTRA river.

১৭৭২ -১৯১২ সন পর্যন্ত কলকাতা ব্রিটিশ ইনডিয়ার রাজধানী ছিল । ১৮৭০ সনের দিকে ফরিদপুরকে রাজধানীর সাথে সড়ক যোগাযোগের মাধ্যমে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত থেকে ধরে নেয়া যায় যে ব্রিটিশ রাজও এই জনপদকে( ফরিদপুর) গুরুত্বের সাথে গন্য করে । যশোর রোড যখন নির্মান হয় তখন মোটর গাড়ি যানবাহন হিসেবে ব্যবহার হতো না।এই রাস্তা তৈরি সে সময়ের যানবহন চলাচলের উপযোগি করে, যেমন চাকার গাড়ি হিসেবে গরু ও ঘোড়ার গাড়ি, অন্যান্য পরিবহনে যেমন পাল্কি, সাইকেল, ঘোড়া ইত্যাদ্দি।

ফরিদপুর শহরে পৌরসভার অধিনে একটি পৌর এলাকা আছে যার নাম ‘কুঠিবাড়ি কমলাপুর।আমার ধারণা কুঠিবাড়ি কমলাপুরের কিছু অতি বয়স্ক লোক ব্যতিত এই নামকরনের কারণ বলতে পারবে না।সতেরো শতকের শেষের দিকে ফরিদপুর জেলায় নীলের (Indigo) চাষ ও ব্যবসা শুরু করে একটি ব্রিটিশ/ ইউরোপিয়ান কোম্পানি। ঐ কোম্পানি এই বাড়ি/কুঠিটি নির্মান করে। বাড়িটি কুঠিবাড়ি বা নীলকুঠি হিসাবে পরিচিত । এই ‘কুঠিবাড়ি’, বর্তমান তারার মেলের রাস্তার ঐ দিকটায় অরস্থিত ছিল। আমাদের সময় কুঠিবাড়ির আশপাশ ঝোপঝাড়ে ভরা ছিল তাই ওদিকটায় লোকজনের যাতায়াত ছিল না ।নির্জন ,ঝোপঝাড়ে ভর্তি ও সাপকোপের ভয়ে সাধারনতো ওদিক কেউ যেত না, যার কারণে শহরের বেশীর ভাগ লোকেরই কুটিবাড়ি সম্পর্কে ধারণা ছিল না।আমরা জানতাম এই ঝোঁপের ভিতর একটি পুরনো নীলকুঠি/ কুঠিবাড়ি আছে। আমরা কয়েকজন মিলে দেখতও গিয়েছি , দুর থেকে ঝোপের ভিতর একটি বাড়ী আছে দেখেছি, কাছে গিয়ে দেখিনি। বাড়িটি এখন আর নেই, ভেঁঙ্গে ফেলা হয়েছে। এটা একটা ঐতিহাসিক স্থাপনা যা অবশ্যই সংরক্ষন করা উচিত ছিল। অন্য জেলার নীলকুঠি গুলি সংরক্ষন করা হয়েছে।ঝিনাইদহ দৌলতপুর ও মেহেরপুর নীলকুটি বাংলাদেশ প্র্ত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তর প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা হিসেবে নথিভুক্ত করে। নীলফামারী জেলার নামকরন নীল চাষ থেকে, নীলকুঠির স্থাপনাগুলো পরিত্যক্ত অবস্থায় এখনও বিদ্যমান। পত্নতাত্বিক অধিদপ্তর এগুলো নথিভুক্ত করছে কিনা জানা নেই ।এবার ইতিহাসের দিকে তাকাই , প্রথমে আসি নীল(Indigo) কি ? নীল একটি ডাই (Dye) , আমরা যেমন চুলে ডাই করি নীলও এরকম একটা Dye যা সাধারনত কাপড়ে/ সুতোয় রং(Colour) করতে ব্যবহার করা হতো। নীল এক ধরনের উদ্ভিতকে প্রক্রিয়াজাত করে প্রস্তুত করা হত। এই উদ্ভিত চাষই নীল চাষ নামে পরিচিত। নীল গাছের একটি ছবি যুক্ত করলাম। সতেরো ও আঠারো শতকে ইউরোপের শিল্প বিপ্লবের সময় মিলের কাপড়ে রং করার প্র্রয়োজনে নীলের চাহিদা আকাশচুম্বী হয়। আর এই চাহিদা মেটাতে ইউরোপিয় ব্যবসায়ীরা ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসকের সহযোগিতায় অবিভক্ত বাংলার বেশ কিছু জেলায় নীল চাষ শুরু করে। বাংলাদেশের নীলফামারী সহ বৃহত্তর রংপুর জেলা, যশোর,কুষ্টিয়া, পাবনা ,ঢাকা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও ফরিদপুর জেলায় নীল চাষ শুরু হয়। ফরিদপুর জেলায় ৫২ টি নীলের কারখানা ছিল, মিরগন্জে একটি বড় কারখানা ছিল এবং Dunloff নামের এক ব্যক্তি কোম্পানীর প্রধান ম্যানেজার ছিলেন তিনি বেশীর ভাগ সময় মিরগন্জে থাকতেন । আমার ধারনা ফরিদপুর শহরের কুঠিবাড়িটি Dunloff সাহেবের অফিস কাম বাসা ছিল অথবা শুধুই বাসা বা বাংলো ছিল। অন্য জেলার নীলকুঠি থেকে ফরিদপুর শহরের কুঠিবাড়ি ( নীলকুঠি ) সম্পূর্ণ আলাদা। নীলকুঠি বলতে নীলের কারখানা, কর্মচারি ও অফিসারের বাসস্থান, গুদাম, ইত্যাদিসহ পুরো একটা কমপ্লেক্স ।মেহেরপুরের নীলকুঠি ৭৭ একর জমির উপর নির্মিত। আমার ধারণা শহরের কুঠিবাড়িটি নির্মিত হয়েছে অষ্টাদশ শতাব্দির শেষের দিকে যেখেতু Dunloff সাহেবের ফরিদপুর আগমন ১৭৮৯ সনে।ফরিদপুর জেলার নীল ব্যবসা পরিচালনা করার জন্য জেলা হেডকোয়াটারে কোম্পানীর অফিস ও রেষ্টহাউজ হিসেব এই কুঠিবাড়ি নির্মান করা হয় । ধারনা করছি ‘কুঠিবাড়ি কমলাপুর’ নামকরনের সময় এটি একটি উল্লেখযোগ্য স্থপনা ছিল বা একমাত্র দৃশ্যমান বিল্ডিং/ দালান ছিল। এখন প্রশ্ন কুঠিবাড়িটি কোথায় অবস্থিত ছিল।ঐ এলাকায় নুতন ঘরবাড়ি নির্মান শুরু হয় ১৯৮০ সনের দিকে। আমার ধারনা কুঠিবাড়ি ভেঙ্গে সুইট ফিরোজার রহমান বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। তাই যদি হয় তাহলে যারা এ কাজটা করেছে তাদের খোঁজ নেয়া উচিত ছিল এ স্থাপনাটির কোন ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্বিক গুরুত্ব আছে কিনা? কুঠিবাড়ির সঠিক স্থান (Location) বের করা খুবই সহজ , এর জন্য সরকারি ভুমি অফিসের সহযোগিতা লাগবে। ১৯৪১-৪৪ সনের ভূমি জরিপের (Survey) ম্যাপ ব্যবহার করে ১০০% সঠিকভাবে বিল্ডিংয়ের অবস্থান নির্ণয় করা যাবে। আমরা আর একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন হারালাম।জানিনা প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের কাজ কি ?নীল চাষীদের বিদ্রোহের গৌরবান্বিত ইতিহাস আছে ফরিদপুর জেলার। ১৮৩৮ সনে হাজী শরিয়াতুল্লার সুযোগ্য পুত্র মহসিন উদ্দিন আহমেদের,বেশী পরিচিত দুদু মিয়া নামে, নেতৃত্বে চাষীরা নীল কোম্পানীর নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, নীলকুঠি আক্রমন করে তছনছ করে দেয় এরং জমিদারদের খাজনা দেয়া বন্ধ করে দেয় । জমিদার ও নীল কোম্পানী দুদুমিয়ার বিরুদ্ধে মামলা করে, ফলোস্রুতিতে ১৮৩৮, ১৮৪৪, ১৮৪৭ সালে উপনিবেশিক সরকার তাকে গ্রেফতার করে। কোন সাক্ষী না পাওয়ায় তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।এখান থেকেই নীল চাষীদের বিদ্রোহ শুর এবং অবিভক্ত বাংলার অন্য জায়গায়ও এর প্রভাব পরতে থাকে। যশোর ও নদিয়া জেলায় ১৮৫৯ সনে বড় আকারের বিদ্রোহ হয় এবং ১৯৬২ সনের পর থেকে ইউরোপীয় নীল আবাদকারীরা আস্তে আস্তে নীল চাষ বন্ধ করে দেশে ফিরে যেতে থাকে ।ফরিদপুর জেলার গৌরবোজ্জল ইতিহাসের ( দুদু মিয়ার ইতিহাস) সাথে সম্পর্কিত কুঠিবাড়ি কমলাপুরের ‘কুঠিবাড়ি’ কিভাবে কোন রকম চিন্তাভাবনা ছাড়া ভেঙ্গে ফেলা হলো?

লিখেছেন জনাব কামরুল বারি কামাল।